ময়মনসিংহ থেকে আলাদা হয়ে টাঙ্গাইল ১৯৬৯ সালে স্বতন্ত্র একটি জেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। একইভাবে ১৯৭৮ সালে দেশের ২০তম জেলা হিসেবে জামালপুরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৮৪ সালে মহকুমা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেশের সব মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হয়। ফলে ঢাকা বিভাগের অধীন ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও জামালপুর ছাড়াও এ অঞ্চলে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও শেরপুর নামে আরও তিনটি জেলার যাত্রা শুরু হয়। ২০১৫ সালে ঢাকা বিভাগ ভেঙে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা নিয়ে নতুন ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হয়। তার মানে বর্তমানে ঢাকা বিভাগের অধীন টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলা আর ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুর ময়মনসিংহ বিভাগের অধীন। যুগের চাহিদা অনুযায়ী প্রশাসনিক সংস্কার ও বিভাগ-বিভাজন যাই হোক না কেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ বলতে মূলত উল্লিখিত ছয়টি জেলাকেই বোঝায়।
সে হিসাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয়টি জেলায় (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও শেরপুর) এখন মোট ৬০টি উপজেলা। ৬০টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র গফরগাঁও উপজেলায় প্রথম একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় (উপজেলা স্তরে)।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালে গফরগাঁও কলেজটি প্রতিষ্ঠার সময় উপজেলা তো দূরের কথা, অনেক জেলা শহরেও কোনো কলেজের অস্তিত্ব ছিল না। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ অন্তত ১৬টি জেলা সদরের প্রধান কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় গফরগাঁও কলেজের পরে। আরও একটি কথা; ১২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বর্তমান ময়মনসিংহ জেলায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন যে ৪১টি কলেজ রয়েছে, তার মধ্যে গফরগাঁও উপজেলাতেই রয়েছে পাঁচটি কলেজ; একমাত্র গফরগাঁও ছাড়া ময়মনসিংহের আর কোনো উপজেলায় ডিগ্রি স্তরের পাঁচটি কলেজ নেই।
একসময় শিক্ষানগরী হিসেবে ময়মনসিংহ শহরের পরিচিতি ছিল। উপজেলা হিসেবে অপেক্ষাকৃত ছোট জনপদ হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গফরগাঁওয়েরও ভিন্ন একটি পরিচয় ও সুখ্যাতি ছিল। সরকারি গফরগাঁও কলেজ তো বটেই, ওখানকার শতবর্ষী বেশ কটি স্কুল ও মাদ্রাসাও গফরগাঁওকে বিশিষ্টতা দান করেছে। ছয়টি জেলা সদর বাদ দিলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৫৬টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র গফরগাঁও কলেজটিই প্রথম সরকারি হয়। এরশাদের শাসনামলে গফরগাঁও কলেজ এবং গফরগাঁও ইসলামিয়া হাইস্কুল—এ দুটি প্রতিষ্ঠান ১৯৮৫ সালে সরকারীকরণ হওয়াটা সে সময়ের এক আলোচিত ঘটনা ছিল।
কিন্তু একদা শিক্ষাদীক্ষায় আলোকোজ্জ্বল গফরগাঁও উপজেলায় আজ আমরা এ কোন নিদারুণ চিত্র দেখতে পাচ্ছি? ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপজেলাটিতে মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সুযোগ আছে। এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি হলো ডিগ্রি কলেজ, দুটি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ এবং তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। উল্লিখিত ১০টির মধ্যে গফরগাঁও কলেজ এবং চারবাড়িয়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ দুটি সরকারি; বাকি ৮টি বেসরকারি (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন)। ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বলতে গেলে সবগুলো প্রতিষ্ঠানই অত্যন্ত খারাপ ফল করেছে। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড এমনিতেই অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় ফলাফলের দিক দিয়ে বেশ পিছিয়ে (পাসের হার ৫১.৫৪%), তার মধ্যে উপজেলার কোনো প্রতিষ্ঠানই ময়মনসিংহ বোর্ডের অর্জিত পাসের হারটির ধারেকাছেও নেই। সরকারি দুটিসহ সব কটি কলেজের এমন ফলকে হতাশাজনক বললেও বোধ করি কম বলা হবে। ময়মনসিংহের অন্যগুলো যেমনই হোক, গফরগাঁও উপজেলার শিক্ষা-দীক্ষা ও ঐতিহ্য বিবেচনায় এ যেন এক নিদারুণ হতাশার চিত্র।
শিক্ষার এমন নিদারুণ চিত্র কি কেবল ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়েরই? কেবল ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলের মধ্যেই কি তা আবদ্ধ? না, আমি তা মনে করি না। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা—বলতে গেলে সব স্তরেই বছরের পর বছর ধরে এক নাজুক পরিস্থিতি বিরাজমান। দেশে হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উপজেলা কিংবা জেলা স্তর; কয়টির খবর আমরা রাখি কিংবা জানি? সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় আশার ভেলায় দুলতে দুলতে শেষ পর্যন্ত কোথায় এসে পৌঁছেছি? মেঘে মেঘে বেলা তো অনেক হলো। শিক্ষাক্ষেত্রে বাগাড়ম্বর ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভুলে আমরা এবার সামনের দিকে এগোতে চাই। পথটি হয়তোবা মসৃণ নয়, তবে আর কিছু যেমনই হোক সদিচ্ছা আমাদের অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। নতুন সরকার এবং বিশেষ করে নতুন শিক্ষামন্ত্রী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার করুণ দশা লাঘবে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন, সেটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।