সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি—বাংলাদেশের জনজীবনে এই দুটি শব্দ বহু বছর ধরেই একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। সরকার আসে, সরকার যায়; মন্ত্রিসভা বদলায়, নীতির ভাষা বদলায়; কিন্তু মহাসড়কের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায় না। বরং অনেক সময় পরিস্থিতি আরও জটিল ও দুঃসহ হয়ে ওঠে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
এই প্রেক্ষাপটে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম একটি মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য—সড়কে যে অর্থ আদায় হয়, তাকে তিনি সরাসরি ‘চাঁদা’ হিসেবে দেখেন না; মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি নাকি তা তাঁদের কল্যাণে ব্যয় করে। তাঁর ভাষায়, ‘চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়।’ এই সংজ্ঞা নিছক শব্দের খেলা, নাকি বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করার কৌশল—সেই প্রশ্ন এখন জনমনে।
মন্ত্রী যে যুক্তি দিয়েছেন, তা মূলত একটি ‘সমঝোতার অর্থ’ বনাম ‘জোরপূর্বক আদায়’-এর পার্থক্য দাঁড় করায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মহাসড়কে পণ্যবোঝাই ট্রাক যখন পাঁচ-সাতটি পয়েন্টে থামিয়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য হয়, সেটি কি সত্যিই স্বেচ্ছায় দেওয়া অর্থ? একজন ট্রাকচালক বা পরিবহনমালিক কি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—তিনি দেবেন কি দেবেন না? বাস্তবতা হলো, এই অর্থ না দিলে গাড়ি আটকে দেওয়া, হয়রানি, এমনকি শারীরিক হুমকির আশঙ্কা থাকে। ফলে ‘সমঝোতা’ শব্দটি এখানে প্রায়ই একপ্রকার বাধ্যতামূলক সমঝোতা। আইনের চোখে যেকোনো অননুমোদিত অর্থ আদায়ই বেআইনি। সেটি শ্রমিককল্যাণের নামে হোক বা টোকেন মানির নামে—আইনগত ভিত্তি না থাকলে তা চাঁদাবাজিই।
মন্ত্রী যদি সত্যিই মনে করেন এই অর্থ শ্রমিককল্যাণে ব্যয় হয়, তাহলে সেই ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব কোথায়? কত টাকা তোলা হয়, কোথায় জমা হয়, কীভাবে ব্যয় হয়—এ নিয়ে কি কোনো নিরীক্ষা আছে? রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থেকে অর্থ আদায় করে কল্যাণের নামে ব্যয় করার এই প্রক্রিয়া নিজেই একটি অস্বচ্ছ ও অনৈতিক চর্চা। যদি বছরে কোটি কোটি টাকা এই খাতে আদায় হয়, তার ১৫-২০ শতাংশও যদি স্বচ্ছভাবে শ্রমিকদের উন্নয়নে ব্যয় হতো, তাহলে দৃশ্যপট ভিন্ন হতে পারত। শ্রমিকদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি, দুর্ঘটনা বিমা বা অবসর ভাতা চালু করা যেত। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানে তেমন উন্নতি দেখা যায় না। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত শ্রমিকদের পরিবার প্রায়ই পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। ফলে ধারণা জন্মায়—অর্থ আদায়ের অজুহাত থাকলেও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নেই। এই অস্বচ্ছতা দূর না করে চাঁদাকে ‘অলিখিত বিধি’ বলা সমস্যাকে আরও জটিল করে।
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে নানা কাঠামোগত কারণ থাকলেও পরিবহন ব্যয় একটি বড় এবং প্রায় অদৃশ্য চাপ। বন্দর বা উৎপাদনকেন্দ্র থেকে জেলা শহরে পণ্য আনার পথে যদি একটি ট্রাককে একাধিক স্থানে ৫০০, ৭০০ কিংবা তারও বেশি টাকা দিতে বাধ্য করা হয়, সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত পরিবহন খরচেই যোগ হয়। ব্যবসায়ী স্বেচ্ছায় এই বাড়তি ব্যয় বহন করেন না; তিনি তা পণ্যের মূল্যে সমন্বয় করেন। ফলে বাড়তি চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার কাঁধে। সরকার বা কোনো শ্রমিক সংগঠন তখন গ্রাহকের এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় নেয় না। অর্থাৎ চাঁদাবাজির সরাসরি আর্থিক অভিঘাত বহন করে সাধারণ মানুষই।
চাঁদাবাজির এই জাল বড় করপোরেট থেকে ফুটপাতের ছোট চায়ের দোকান—সবাইকে ছুঁয়ে যায়। গত ৫৫ বছরেও এর অবসান হয়নি; এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে একজনকে দিতে হতো, এখন চার-পাঁচজনকে দিতে হয়। সবচেয়ে বেশি চাপ সড়কপথে। যশোর থেকে সবজিভর্তি ট্রাক নিয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত আসতে এক বিক্রেতাকে অন্তত চারটি পয়েন্টে টাকা গুনতে হয়। এ চিত্র কোনো একটি রুট বা পণ্যের নয়—প্রায় সব পথ, সব পণ্য পরিবহনে একই বাস্তবতা। চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। চাঁদাবাজদের জার্সি বদলায়, কিন্তু ব্যবস্থার চরিত্র বদলায় না।
সরকার যদি আন্তরিকভাবে মহাসড়কের এই ‘টোকেন মানি’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে পারে, তাহলে পরিবহন ব্যয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমবে। পরিবহন ব্যয় কমলে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ সহজ হবে, দ্রব্যমূল্য কিছুটা হলেও সহনীয় পর্যায়ে নামার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আড়তপর্যায়ের চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি, কারণ সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হলে তার সামষ্টিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটেই।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মহাসড়কে বহু বছর ধরে শ্রমিকসংগঠনের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রায়ই শোনা যায়, ক্ষমতাসীন দল বা শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে এসব কার্যক্রম চলে। সরকার বদলায়, কিন্তু সংগঠনগুলোর রং বদলায়; প্রক্রিয়া থেকে যায় একই। এই সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরে সহনশীলতা, আপস এবং রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ফলে নতুন কোনো মন্ত্রী এসে কেবল সংজ্ঞা বদলে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। বরং এতে একটি ভুল বার্তা যায়—রাষ্ট্র যেন অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়কে বৈধতা দিচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে সড়কে যেকোনো অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধ করতে হবে।
পুঁজিবাদে মুক্তবাজারের ধারণা হলো—পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারণ করবে বাজারের চাহিদা ও জোগান। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে যে কম দামে ভালো পণ্য দিতে পারে, সে বেশি বিক্রি করবে। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক সময় বড় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তোলে, যাকে কার্টেল বলা হয়। এই কার্টেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়িয়ে রাখে। পরিবহন ব্যয়, আড়তের চাঁদাবাজি, মহাসড়কের টোকেন মানি—সব মিলিয়ে একটি অদৃশ্য ব্যয়ের জাল তৈরি হয়। সাধারণ ক্রেতা তখন বুঝতেই পারেন না কেন হঠাৎ দাম বাড়ল।
সরকারের কাজ হলো এই কার্টেল ভাঙা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। যদি সরকার নিজস্ব ন্যায্যমূল্যের বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারত—যেমন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে সারা দেশে কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা—তাহলে বড় কোম্পানিগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতো। রাষ্ট্র যখন বিকল্প রাখে না, তখন বাজার পুরোপুরি বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়।
চাঁদাবাজি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার সঙ্গেও যুক্ত। যখন ট্রাককে বারবার থামানো হয়, তখন সময় নষ্ট হয়, চালকদের ওপর চাপ বাড়ে। সময় পুষিয়ে নিতে তারা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে অননুমোদিত চেকপোস্ট বা পয়েন্ট তৈরি হওয়ায় সড়কের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুমোদিত কার্যক্রম ও অননুমোদিত আদায়ের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এতে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
সমস্যার সমাধান কেবল বক্তব্য দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগ। সড়কে কোনো প্রকার অননুমোদিত অর্থ আদায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। শ্রমিককল্যাণের জন্য আলাদা, স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যা রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। পরিবহন খাতে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করলে অনিয়ম কমবে। মহাসড়কে নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং অভিযোগ গ্রহণের সহজ পদ্ধতি চালু করতে হবে।
সড়কের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি নিয়ে মানুষের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু নতুন মন্ত্রীর দায়িত্ব হলো পুরোনো সমস্যাকে নতুন যুক্তিতে বৈধতা দেওয়া নয়, বরং তা সমাধানের সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া। চাঁদাকে ‘সমঝোতার অর্থ’ বললে বাস্তবতা বদলায় না; বরং সমস্যা আড়াল হয়। মহাসড়কে টোকেন মানির নামে অর্থ আদায় বন্ধ করতে পারলে পণ্যমূল্য কমবে, বাজারে স্বচ্ছতা আসবে এবং শ্রমিককল্যাণের প্রকৃত কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের কল্যাণ চায়, তাহলে তাকে অরাজকতা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন হতে হবে। সড়ক কেবল যানবাহনের চলাচলের পথ নয়; এটি অর্থনীতির ধমনি। সেই ধমনিতে যদি অনিয়মের জমাট বাঁধে, তাহলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন সময় এসেছে শব্দের খেলা ছেড়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট