একসময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক ছিল ভারত। কালের পরিক্রমায় সেই ভারতই এখন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখলদার ইসরায়েলের অন্যতম কৌশলগত মিত্র। মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলেই ভারত-ইসরায়েলের সম্পর্ক এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থানে পৌঁছেছে।
স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বললেও ১৯৪৭ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দুই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে জাতিসংঘের পরিকল্পনার বিপক্ষে ভোট দেয় ভারত। ভারতের অবস্থান তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়। ১৯৫০ সালে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৩ সালে মুম্বাইয়ে ইসরায়েল কনস্যুলেট খোলে। এরপর ক্রমেই দুই পক্ষ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। কিন্তু তা আনুষ্ঠানিক রূপ পায় ২০১৭ সালে মোদির ইসরায়েল সফরের মধ্য দিয়ে।
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের মূল ভিত্তি মূলত আদর্শিক এবং সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা। ভারত ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ২০০২ সালে মহাকাশ গবেষণা সহযোগিতার জন্য ইসরায়েলি মহাকাশ সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র চায় ভারত। সে সময় তো বটেই, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালেও ভারতকে অস্ত্র দেয় ইসরায়েল।
সোভিয়েতের পতনের পর ইসরায়েলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতায় পরিণত হয় ভারত। ২০১৯ সালেই ২৫০ কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে যৌথ কর্মসূচি নেয় ভারত ও ইসরায়েল। সমরাস্ত্র বেচাকেনা পর্যবেক্ষকদের হিসাবে ভারত এখন ইসরায়েলের অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা। যেখানে প্রতিবছর ১০০ কোটি ডলারের বেশি অস্ত্রের বাণিজ্য হয় এই দুই দেশে। সম্পর্ক শুধু প্রতিরক্ষা খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ২০০৬ সালে দুই দেশের মধ্যে কৃষি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি হয়।
নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। ২০১৭ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফরে যাওয়ার পর মোদিকে নেতানিয়াহু ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেন। এরপর একই বছর ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে আসেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
গত আড়াই বছরে ভারত ইসরায়েলের পাশে থেকেছে। শ্রমিক, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নেতানিয়াহুকে ফোন করা প্রথম নেতা হিসেবে মোদিকে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়। এই পদক্ষেপ দিল্লির পক্ষ থেকে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার বর্ণনার প্রতি সংহতির সুর নির্ধারণ করে দেয়। এর মাধ্যমে গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের প্রতি ভারতের অটল সমর্থনের পথ তৈরি হয়।
ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই সম্পর্কের বুনন আরও ঘন হয়েছে। তিনি (মোদি) এখানে আসছেন, যাতে আমরা আমাদের সরকার ও দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার নানা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এটিকে আরও শক্ত করতে পারি। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা।’
ইসরায়েল ও ভারতের বিজেপি—উভয় পক্ষই বিশেষভাবে মুসলিমবিদ্বেষী। ২০১৯ সালের নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তীকে বলতে শোনা যায়, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ‘ইসরায়েলি মডেল’ গ্রহণ করা উচিত। জ্যেষ্ঠ এই কূটনীতিক দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ডানপন্থী বসতি স্থাপনের প্রসঙ্গ টেনে কাশ্মীরি হিন্দুদের পুনর্বাসনের কথা বলছিলেন। যারা ১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর পর নিজেদের আবাসভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে এটা হয়েছে। ইসরায়েলিরা যদি পারে, আমরাও পারব।’ আরও যোগ করেন, মোদি সরকার এ বিষয়ে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
কাশ্মীর তো বটেই, ভারতের অন্যান্য অংশে সেটাই যেন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। হিন্দুত্ব দর্শন থেকে উদ্ভূত মোদির বিজেপি ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বিশ্বের সব হিন্দুর জন্য ভারতকে মাতৃভূমি হিসেবে দেখে তারা, যা ইসরায়েলের মতো নিজেকে ইহুদি মাতৃভূমি হিসেবে দেখার ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘হস্টাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক ও সাংবাদিক আজাদ ঈসা বলেন, ‘মোদির অধীনে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক দুটি মতাদর্শের বন্ধন, যারা নিজেদের সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবে দেখে এবং মুসলিমদের জনসংখ্যাগত নিরাপত্তা হুমকি বলে মনে করে।’ তাঁর মতে, এই বন্ধুত্ব কাজ করার কারণ হলো—তাদের শ্রেষ্ঠত্ববাদী লক্ষ্য। দিল্লি বড় শক্তি হয়ে ওঠার পথে ইসরায়েলকে একটি টেমপ্লেট হিসেবে দেখতে শুরু করে।
ইসরায়েল থেকে ধার নেওয়া ভারতের সবচেয়ে সমালোচিত আইডিয়ার একটি বিজেপির তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’ নীতি। গত এক দশকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে শত শত মুসলিমের বাড়ি-দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একাধিক মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি নোটিশ ছাড়াই এসব উচ্ছেদ করা হয়েছে। সাধারণত ধর্মীয় উত্তেজনা, মোদি সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কিংবা কখনো স্থানীয় বিরোধ ধর্মীয় রূপ নেওয়ার পর এসব অভিযান চালানো হয়েছে। বিজেপির শীর্ষ নেতা উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ সমর্থকদের কাছে এখন ‘বুলডোজার বাবা’ নামে পরিচিত। এটি ইসরায়েলের নীতিরই প্রতিফলন।
ইসরায়েল অবৈধ বসতি স্থাপনের জন্য অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির বাড়ি ভেঙে দিয়েছে এবং বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করেছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে প্রায় সব বাড়িঘর, অফিস, হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও উপাসনালয় ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয়তাবাদ ও সংঘাত গবেষক সুমন্ত্র বোস বলেন, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিশ্বাস-ব্যবস্থা জায়নবাদ ও ইসরায়েলের প্রতি গভীর অনুরাগে পূর্ণ। মোদিসহ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই আদর্শে দীক্ষিত।’ তাঁর মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ও শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলই সেই মডেল, যা মোদির আমলে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতে বাস্তবায়ন করছে।
ভারত ও ইসরায়েল উভয়ই বাড়িঘর গুঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া এবং কে জাতির অন্তর্ভুক্ত আর কে বহিরাগত, তা বোঝাতে রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। আর এখানেই এসে মিলে গেছে দুই পক্ষের আদর্শিক অবস্থান।
ভারতের এই ঘনিষ্ঠতার প্রতিদান হিসেবে ইসরায়েল দেশটিকে ‘বৈশ্বিক পরাশক্তির’ স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন দুই দেশ যৌথভাবে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়েও ভাবছে। আগামী কয়েক বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে চায় ভারত। এর মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার স্ট্যান্ডঅফ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা এবং লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নে যৌথ কাজ। দুই দেশ উচ্চ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়েও সহযোগিতা বাড়াবে।
কেবল তা-ই নয়, ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য ইরানের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কও জলাঞ্জলি দিতে রাজি। ভারতীয়রা হিসাব করছে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরান হয়তো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তখন মধ্যপ্রাচ্যের এক শক্তিধর দেশ হবে ইসরায়েল। আর তেল আবিবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পথ ধরে নয়াদিল্লিও ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে কিছু ফায়দা তোলার চেষ্টা করবে।
সর্বশেষ আদর্শিক বন্ধনের জায়গা থেকেই নেতানিয়াহু ভারতকে নিয়ে ‘উগ্র শিয়া অক্ষ’ এবং ‘উদীয়মান উগ্র সুন্নি অক্ষ’র বিরুদ্ধে, সোজা কথায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘হেক্সাগন’ জোট গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই জোট ভারতকে রাখতে চাওয়ার কারণ হলো—‘বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য সম্পর্কে যেসব দেশের দৃষ্টিভঙ্গি এক’, তাদের নিয়ে একটি অক্ষ বা জোট গঠন করা হবে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর মোদি বলেন, ভারত ও ইসরায়েলের বন্ধনের বিষয়ে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে পুরোপুরি একমত।
কিন্তু, বাস্তবতা অনেক সময়ই হিসাব অনুসারে নির্মিত হয় না। অনেক বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টর সেটির নির্মাণের গতিপথকে যেকোনো সময় যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া মানবিক বিবেচনায়ও ভারত-ইসরায়েলের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য ‘ভালো বার্তা’ নয়।