হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নির্বাচনে সাইবার নিরাপত্তা

সাদিয়া সুলতানা রিমি

একবিংশ শতাব্দীর নির্বাচন আর শুধু ব্যালট বাক্স, ভোটকেন্দ্র কিংবা ভোট গণনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। দৃশ্যমান এই প্রক্রিয়ার আড়ালে সমান্তরালভাবে চলছে আরেকটি অদৃশ্য সাইবার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ ভয়ংকর, নীরব এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবসম্পন্ন। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনী ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা আজ গণতন্ত্র রক্ষার মৌলিক শর্ত।

তথ্য এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, আর সেই তথ্য যদি সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলোও সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। ভোটার ডেটাবেইস হ্যাক, ফলাফল ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়া, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা—এমন ঘটনা বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের পেছনেও সাইবার মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বরং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে সাইবার ঝুঁকির মাত্রাও বাড়ছে। ভোটার তথ্য একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ডেটার মধ্যে পড়ে। এই তথ্য ফাঁস হলে বা বিকৃত হলে কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। একইভাবে নির্বাচনসংক্রান্ত গুজব ও ভুয়া তথ্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সব ধরনের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে নির্দেশ তিনি দিয়েছেন, তা শুধু প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি গণতন্ত্র রক্ষার একটি কৌশলগত ঘোষণা। সম্প্রতি তাঁর সরকারি বাসভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সভায় তিনি স্পষ্ট করে এসব কথা বলেছেন। তিনি কেবল নির্বাচন নয়, সামগ্রিক নাগরিক সেবার সাইবার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের অন্যান্য ডিজিটাল অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ—সবকিছুই পরোক্ষভাবে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। এসব খাত দুর্বল হলে নির্বাচনী ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইতিমধ্যে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। শুধু তালিকাভুক্ত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এসব প্রতিষ্ঠানের সাইবার সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়মিত নিরীক্ষা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার আপডেট এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচনের সাইবার নিরাপত্তা একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে জড়িত আছে ভোটারদের ডিজিটাল সচেতনতা। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখছি, পড়ছি সবকিছুই যে সত্য নয়—এই বোধ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ভুয়া খবর শনাক্ত ও যাচাই করার সক্ষমতা না থাকলে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হয়।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এবং গুজব প্রতিরোধে সক্রিয় অবস্থান গণমাধ্যমকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নৈতিক দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। শক্তিশালী সাইবার অবকাঠামো গড়ে তোলা, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, ডেটা এনক্রিপশন, বহুমাত্রিক যাচাইকরণ (মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) এবং জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া আধুনিক নির্বাচন কল্পনাই করা যায় না। কোনো সাইবার হামলা হলে কীভাবে, কত দ্রুত এবং কারা তা মোকাবিলা করবে—এই রোডম্যাপ আগেই প্রস্তুত রাখা জরুরি।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি মানুষের আস্থা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে তাদের ভোট নিরাপদ, তথ্য সুরক্ষিত এবং নির্বাচনী ফলাফল অবিকৃত, তবেই নির্বাচন অর্থবহ হয়। সেই আস্থা নষ্ট হলে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যার কোনো গণতান্ত্রিক মূল্য থাকে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

লে হালুয়া!

মাদুরোকে নিয়ে যে বার্তা পেল বিশ্ব

ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কার হাতে

ইরানে রেজিম পরিবর্তন কি আসন্ন

গণতন্ত্র, ভোট ও মৌলিক অধিকার

মেগা প্রকল্প পরিত্যাগ নয়, প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্তকরণ

নিজের হাতে আইন

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে...

খেজুরের গুড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ুক

এলপিজির দামে নৈরাজ্য