হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত: দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রভাব

আব্দুর রহমান

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ছবি: এএফপি

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে এক উন্মুক্ত সংঘাত শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এটিকে ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’ বলে ঘোষণা করেছেন। এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান—দুই দেশের প্রতিবেশী ইরানে ইসরায়েলি-মার্কিন আগ্রাসনে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে মূল ঝামেলা আসলে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির মতো সশস্ত্র সংগঠনকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মঘাতী হামলাসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে। যাতে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি প্রাণ হারিয়েছে। পাকিস্তানের অভিযোগ আফগানিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তালেবান টিটিপিকে মদদ দিচ্ছে। যদিও তালেবান সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে বারবার।

সাম্প্রতিক সময়ে এসে ইসলামাবাদ-কাবুল সংঘাতের পেছনে জঙ্গিবাদ বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করলেও ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের মূল কারণ সীমান্ত বিরোধ এবং পানিবণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বই বর্তমানে সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের শুরু থেকে উত্তপ্ত হয়ে ২০২৬ সালে এই সংঘাত যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। আঞ্চলিকভাবে, এটি চীনের ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর’ বা সিপিইসি এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্পকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সিপিইসি প্রকল্পের গোয়াদর-কাশগড় রুটে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে। পাকিস্তান এসব হামলার পেছনে টিটিপি এবং বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করেছে। ২০২৫-২৬ সালে এই রুটে চীনা কর্মীদের ওপর ২৫ বারের বেশি হামলা হয়েছে। যার ফলে চীনের ৬২ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ৩০ শতাংশ ধীরগতিতে চলছে।

এ ছাড়া, সংঘাত চলতে থাকায় আফগানিস্তানের ১০ বিলিয়ন ডলারের কপার খনির কার্যক্রম শ্লথ হয়ে গেছে। এর ফলে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বার্ষিক ৩ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিআরআই প্রকল্পে পাকিস্তান-আফগানিস্তানকে সংযুক্ত করার প্রকল্পও বন্ধ হয়ে আছে। এই সংঘাতের কারণে খোদ পাকিস্তানের বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে। আফগানিস্তানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ৪০ শতাংশ কমে গেছে। দুই দেশের সীমান্ত ডুরান্ড লাইন বন্ধ থাকায় দুই পাশেই ৫০ হাজার মালবাহী ট্রাক আটকা আছে। এ ছাড়া এই সংঘাতে দুই পক্ষেরই সামরিক ব্যয় বিশাল। পূর্ণ মাত্রার সংঘাত হলে প্রতি মাসে ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত ভারতকে কৌশলগতভাবে লাভবান করছে। কারণ, পাকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ সেনা আফগান সীমান্তে মোতায়েন হওয়ায় কাশ্মীর অঞ্চলে ভারতের জন্য কৌশলতগত চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কাশ্মীর অঞ্চলে পাকিস্তানকেন্দ্রিক হামলার সংখ্যা ৩০ শতাংশের মতো কমেছে, যা ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পদকে অন্যান্য অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে, আফগান তালেবান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে এবং ২০০ মিলিয়নের বেশি মানবিক সাহায্য গ্রহণ করেছে, যা ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রভাব ক্ষয় করে ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় লাভ হচ্ছে চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ। এই সুযোগ চীনের সিপিইসিকে বাইপাস করে ১ বিলিয়নের বাণিজ্য সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ করিডর আইএমইসি প্রকল্প দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, যা পাকিস্তানের সাহায্য ছাড়াই ইউরোপে ৫০০ মিলিয়ন আমদানি বৃদ্ধি ঘটাতে পারে এবং খরচ কমাবে ৩০ শতাংশের মতো। মধ্য এশিয়ায় ভারতের গম ও ওষুধ রপ্তানি গত ১২ মাসে ৫০ শতাংশ বেড়েছে ইরানের চাবাহার বন্দরের কারণে।

কিন্তু ইরানে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন ভারতের এই সুবিধাকে আবার চাপের মুখে ফেলেছে। মার্কিন চাপের কারণে ভারতকে চাবাহার বন্দর প্রকল্প থেকে একপ্রকার সরে আসতে হয়েছে বলা যায়।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের সঙ্গে ইরানে বিদ্যমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় দেশেরই সীমান্তবর্তী হওয়ায় দ্বিমুখী চাপে পড়েছে ইরান এবং এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদ, শরণার্থী এবং কূটনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। ইরানে যৌথ আক্রমণ পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

ইরানের সঙ্গে আফগানিস্তানের ৯৪৬ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। দুই দেশের অভ্যন্তরে শাসকগোষ্ঠী দুর্বল হওয়ায় সীমান্তে জাইশ আল-আদলের মতো জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। ইরানের মনোযোগ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের দিকে গেলে আফগান জঙ্গিরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতকে আরও বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। ইরান সামরিক শক্তি বিভক্ত করে ফেলায় দেশটিতে সুন্নি চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়েছে।

ইরানের পতন বা দুর্বলতা শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন জঙ্গি জোট গঠন ঘটাতে পারে। এটি পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধকে বিস্তৃত করে সমগ্র অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

সংঘাতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জঙ্গিবাদের প্রসার। টিটিপির মতো গোষ্ঠী আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে, যা কাশ্মীর ও ভারতীয় সীমান্তে ছড়াতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় আইএসের উত্থান ভারত, বাংলাদেশে ইসলামি চরমপন্থাকে উসকে দিতে পারে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সংঘাতের ঝুঁকির ফলে আন্তদেশীয় সন্ত্রাসবাদ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যকার সংঘাতে বাংলাদেশে সরাসরি সামরিক প্রভাব কম হলেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, রেমিট্যান্স এবং জ্বালানি আমদানিকে ব্যাহত করতে পারে। জঙ্গিবাদের ছড়ানো রাজনৈতিক চরমপন্থাকে উসকে দিতে পারে, যেমন আগের তালেবান শাসনামলেও দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কায় চরমপন্থা এবং মাদক চোরাচালান বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করবে। মালদ্বীপে চীন-ভারত প্রভাব বিস্তারের লড়াই তীব্র হবে। নেপাল ও ভুটানে অভিবাসন এবং বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে, যা ভারতনির্ভর অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে।

এই সংঘাত তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত বা টাপি গ্যাস পাইপলাইন এবং সেন্ট্রাল এশিয়া-সাউথ এশিয়া ইলেকট্রিসিটি ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ট্রেড প্রজেক্টের ১০০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্পকে স্থগিত করতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি সংকট বাড়াবে। পাকিস্তানের রপ্তানি হ্রাস পেলে ভারতীয় বাজারে প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এবং প্রায় স্থবির হয়ে পড়া সার্কের মতো সহযোগিতা সংস্থার কার্যক্রম আরও ব্যাহত হতে পারে।

এই সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন জোট গঠনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ভারত-আফগানিস্তান সম্পর্ক শক্তিশালী হবে এবং চীন-পাকিস্তান জোট আরও শক্তিশালী হওয়ার পথে হাঁটতে পারে। রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করলেও জঙ্গিবাদের ভয়ে ভারতের দিকে ঝুঁকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

মোদ্দাকথা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে তুলছে, যা সব দেশের জন্যই চ্যালেঞ্জ। কূটনৈতিক সমাধান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া এটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এই সংকটে ভারত লাভবান হলেও বিস্তৃত সংকট সেই লাভকে প্রশমিত করতে পারে।

যুদ্ধের আগুনে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি

সহযোগিতার নতুন যুগে বাংলাদেশ ও চীন

ফ্যামিলি কার্ড: কিছু বিবেচ্য বিষয়

ট্যাগ

হুমকি

ট্রাম্প খেলিছে এ বিশ্ব লয়ে

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: এ সংকট দ্রুত কাটবে, এমন আশা করা কঠিন

পিয়নের ক্ষমতা

সমাজের সেই মানবিক বন্ধন গেল কোথায়

বাংলা, বাঙালির মনোজগৎ