ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামীকাল বৃহস্পতিবার। ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগবিহীন (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রথম এই নির্বাচনে বিজয়ী হবে কোন রাজনৈতিক দল বা জোট–এই আলোচনা এখন সর্বত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় নিয়ামক হবে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম এবং আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকার ভোট।
দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশই তরুণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল শক্তি এই তরুণদের অধিকাংশই এবার প্রথম ভোট দেবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাজানো, পাতানো ও ভোটাধিকার হরণের বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে তরুণদের বড় অংশই ভোট দিতে পারেননি। এবার ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতি ব্যাপক হবে। তাঁদের এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট যাঁরা পাবেন, তাঁরাই বিজয়ী হবেন। তাই এই দুই ধরনের ভোট টানতে দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারে চেষ্টাও দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক প্রার্থী নয়, নৌকা প্রতীক দেখে ভোট দেন।
তরুণ ভোটাররা বলছেন, তাঁরা নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ সব অনিয়মের বিরুদ্ধে। পুরোনো ধারার হিংসা-হানাহানির রাজনীতি তাঁরা দেখতে চান না। বৈষম্যহীন সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ, নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, অর্থনীতিকে সচল রাখা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, আইনশৃঙ্খলার উন্নতিসহ নাগরিক অধিকারগুলো তাঁদের আগ্রহের জায়গা। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা কোন দল বেশি গুরুত্ব এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পথরেখা দিয়েছে, সেটা মূল্যায়ন করেই ভোট দেবেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, তরুণ ভোটাররা এবার নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে। তাঁরা পুরোনো রাজনীতিকে বিশ্বাস করেন না। সুতরাং তাঁদের ভোট কোথায় যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে নির্বাচনে জয়-পরাজয়। যেহেতু তাঁরা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের পরিষ্কার ধারণা আছে, কোন দলকে ভোট দিলে জুলাইকে ধারণ বা গ্রহণ করবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ভোট না দিতে আহ্বান জানালেও দলটির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোট দেবেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে মামলা-হামলা, হয়রানি বন্ধসহ নানান প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে বিভিন্ন দলের নেতাদের মুখে। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে ফল নির্ধারক হবেন দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, আওয়ামী লীগের ১০ শতাংশ সমর্থক ভোট দিতে যেতে পারেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যাবেন নিরাপত্তাজনিত কারণে। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা যাবেন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য। এসব ভোট বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টিতে ভাগ হবে। প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও এমন ভোটারকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা তরুণ। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪২১ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপে দেখা গেছে, নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশের সমর্থন জামায়াতের প্রতি। বিএনপিকে সমর্থন করেন ২৭ শতাংশ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি সমর্থন আছে ১৭ শতাংশ তরুণের। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ তরুণ ভোটার কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাফসা বিনতে কামাল বলেন, ‘নারীর নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার ও হয়রানি বন্ধে যে দল কার্যকর ভূমিকা নেবে, আমি তাদেরই বেছে নেব।’
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো চাকরির বিজ্ঞপ্তি আসেনি। যে দল কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে, তাদেরই ভোট দেব।’ প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘যে দল তরুণ উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধ করে বাস্তব সহায়তা দেবে, তারাই আমার ভোট পাবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁদের (তরুণদের) অনেকে এখনো ভোটের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। তাঁদের মধ্যে ভোট দেওয়ার ব্যাপক আগ্রহ আছে। তাঁদের রায় এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তরুণ ভোটাররা এত দিনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন দেখতে চাইবেন। তাঁরা মনে করছেন, চিরাচরিত ব্যবস্থা গণতন্ত্রের স্বাদ দিতে পারেনি। যে জন্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান তো বৈষম্যহীন ও গণতন্ত্রের জন্যই, ভোটে তার প্রতিফলন দেখতে চাইবেন তাঁরা।
পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। ওই চার নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট পেয়েছিল ৩০.০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ ও ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ–এই তিন জাতীয় নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত, কারচুপির ও প্রশ্নবিদ্ধ।
এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে দলটির কর্মী-সমর্থকদের ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে সচেষ্ট বিএনপি, জামায়াতসহ একাধিক দল। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুরের একাধিক আসনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের নিরপরাধ কর্মীদের পাশে থাকবে বিএনপি। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, ‘তারেক রহমান যেহেতু বিএনপির দায়িত্ব দিয়েছে, আমিও আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।’ একাধিক সূত্র বলেছে, নির্বাচনী সভা-সমাবেশে জামায়াত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট না চাইলেও এলাকায় এলাকায় তাঁদের ভোট টানতে কাজ করছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের জেলাপর্যায়ের এক নেতা আজকের পত্রিকাকে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁদের ভোট দিতে নিষেধ করা হলেও তৃণমূল পর্যায়ের অনেকে ভোট দিতে যাবেন। এ ক্ষেত্রে আসন ও কেন্দ্রভিত্তিক প্রভাব কাজ করবে। কিছু আসনে বিএনপির দিকে ভোট যাবে, কিছু আসনে দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে আবার কিছু আসনে জামায়াতের পক্ষে। তবে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ভোট মূলত বিএনপির দিকেই যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বড় একটি অংশ ভোট দেবেন বলে তাঁর ধারণা। যে যত কথাই বলুক, দলটির সমর্থকদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি কাছাকাছি চিন্তা-চেতনার ও আদর্শিক মিল থাকা দলকে। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা চিন্তা করবেন। তাঁর ধারণা, তাঁদের বেশির ভাগ ভোট যাবে বিএনপিতে।
সিআরএফ ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপের ফল অনুযায়ী, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাঁরা আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাঁদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন। জামায়াতকে দেবেন ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ, এনসিপিকে দেবেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার। ১৩ শতাংশ ভোটার অন্যদের ভোট দেবেন। সিদ্ধান্ত নেননি ২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী এলাকাছাড়া। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। কারাগারেও আছেন অনেকে।
ড. সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অনেকে ভোট দিতে যেতেও পারেন। কারণ তাঁদের তো এলাকার মানুষ চেনে, ঘর থেকে বের হতে হবে। নিরাপত্তার কারণে ক্ষতিকারীদের পক্ষেও ভোট যেতে পারে।