সেবা খাতে দুর্নীতি কমাতে এবং নাগরিক সেবা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করতে সমন্বিত কৌশলপত্র প্রণয়ন, সরকারি সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। দেশের ১৮টি খাত ও সেবার ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ১০ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করেছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের ৩১ দফাভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার রূপরেখা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সেবা খাতের জন্য একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য সব কর্মপরিকল্পনায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উপাদান সক্রিয়ভাবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। তাই দুর্নীতির অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যত কমানো যাবে, অনিয়ম ও ঘুষের সুযোগও তত কমবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করতে হবে এবং নাগরিকদের অনলাইনে সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি জনগণের তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান বা ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সেবাদাতাদের জন্য যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে সেবা প্রদান করতে হবে, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে —এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। পাশাপাশি সেবা গ্রহণের পর নাগরিকদের মতামত নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বার্ষিক মূল্যায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
সেবা খাতে হয়রানি কমাতে অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গ্রিভেন্স রিড্রেস সিস্টেম (জিআরএস) অধিকতর ব্যবহারবান্ধব করার পাশাপাশি এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। অভিযোগ জানাতে নাগরিকদের জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
টিআইবির সুপারিশ অনুযায়ী, সব সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বাক্স স্থাপন, এসএমএস, ই-মেইল ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু ও কার্যকর করার পাশাপাশি এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও কার্যকর করতে প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং দুদকের হটলাইন ১০৬-এর ব্যাপক প্রচারণারও সুপারিশ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার জন্য রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে এবং অভিযোগগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেবাগ্রহীতাদের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি ও ফলাফল নিয়মিত ওয়েবসাইট বা নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগকারীকে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তা জানাতে হবে।
টিআইবি মনে করে, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষার মতো অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নাগরিকেরা যাতে সহজে বিভিন্ন সেবাসংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন, সে জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটকে আরও কার্যকর ও হালনাগাদ রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সেবাগ্রহীতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ ও হালনাগাদ করতে হবে, যাতে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার জন্য আলাদা আবেদন করতে না হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি ও কৃষিসহ যেসব খাতে জনবল, অবকাঠামো ও লজিস্টিক সংকটের কারণে সেবাদান ব্যাহত হয়, সেসব খাতের ঘাটতি দূর করতে হবে এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী প্রতিবছর বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করে জমা দিতে হবে। সম্পদ বিবরণীতে কোনো অসংগতি বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলন ও নাগরিক অংশগ্রহণ জোরদার করতে হবে।