হোম > জাতীয়

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি: লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার মধ্যে বাড়তি বিলের ভয়

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

প্রতীকী ছবি

গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ খাতে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। দিনে-রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে সরকারের তোড়জোড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে অস্বস্তিকর লোডশেডিং, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা—দুই সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে জীবন- যাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়লে নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়বে। একদিকে গরমের কষ্ট, অন্যদিকে বিদ্যুৎ-সংকট—সব মিলিয়ে জনজীবনে তৈরি হয়েছে চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগ।

রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন আর আগের মতো স্থিতিশীল নেই। মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় দিনে ৩ থেকে ৫ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও ২০-৩০ মিনিট, কোথাও আবার এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ, খুলশী, বায়েজিদ ও হালিশহর এলাকায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর থেকে লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানপাট ও অফিস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। খুলনায় সোনাডাঙ্গা, ময়লাপোতা ও নিউমার্কেট এলাকায়ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, টঙ্গী ও শ্রীপুরে বিদ্যুৎ-সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অনেক কারখানা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে।

মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক। মুন্সিগঞ্জ শহরে দিনে ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মানিকগঞ্জে সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ফরিদপুরের সালথা, বোয়ালমারী ও নগরকান্দা উপজেলায় গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সালথার এক কৃষক বলেন, ‘বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে নদীভাঙন এলাকার গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও লালমনিরহাটে লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। রংপুর শহরে দিনে ৫-৬ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দিনাজপুরের বিরামপুর, ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুর এলাকায় ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের গ্রামাঞ্চলে বোরো ধানের সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ে কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পঞ্চগড়ের বোদা ও দেবীগঞ্জ এলাকায় ছোট ব্যবসাগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে।

বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বরিশাল নগরীতে দিনে ৪-৬ বার লোডশেডিং হচ্ছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা এলাকায় ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। ঝালকাঠির নলছিটি ও কাঠালিয়া উপজেলায় রাতে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুর এলাকায় মৎস্য খামার ও হ্যাচারিগুলোতে বিদ্যুৎ-সংকটে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনিয়মিত। সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার, আম্বরখানা, উপশহর ও টিলাগড় এলাকায় দিনে ৫-৭ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।

হবিগঞ্জ শহরে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং চলছে। সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় সেচ ও মাছ চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রামের পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের অনিয়ম দেখা দিয়েছে। দুর্গম এলাকায় দিনে ৮-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর ও কুষ্টিয়ার শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাবনার ঈশ্বরদী আইজিপি এলাকায় কয়েকটি কারখানা বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

যশোরের চৌগাছা ও ঝিকরগাছায় পোলট্রি খামারে বিদ্যুৎ না থাকায় পাখি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও শাহজাদপুরে তাঁতশিল্পেও বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।

দেশের প্রায় সব জেলাতে বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম বিদ্যুৎ-সংকটে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষকেরা ডিজেলচালিত পাম্পের দিকে ঝুঁকছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে চালের বাজারেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে এসএসসি, এইচএসসি ও বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কয়েক দিন আগে ভারতের আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অর্ধেক সক্ষমতায় চললেও বর্তমানে তা পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে (ঘণ্টায় ১৫০০ মেগাওয়াট)। দেশের অভ্যন্তরে মাতারবাড়ী, পটুয়াখালীর পায়রা, বাগেরহাটের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ভালো সক্ষমতায় চললেও এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার কয়লা-সংকটে ধুঁকছে। কেন্দ্রটির ১২২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলে কয়লার অভাবে ৬১২ মেগাওয়াট হারে উৎপাদন করছে। এর বাইরে গ্যাস-সংকটের কারণে স্বল্প উৎপাদনে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি স্বল্পতার কারণে দিনের বেলায় বন্ধ থাকছে। বিকেলে চাহিদা বেড়ে গেলে কিছু কিছু কেন্দ্র চালু হচ্ছে।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বিপপার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম আজকের পত্রিকাকে জানান, লোডশেডিং সংকট সমাধানে আমরা সরকারকে কিছু পরামর্শ দিয়েছি। বাকিটা টাকা না দিতে পারলেও তারা যেন আগের মতো বন্ড ইস্যু করে এবং বিভিন্ন রকম শুল্ক প্রত্যাহার করে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তুতি

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ কমাতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। প্রতি ইউনিটে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভর্তুকির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তাই মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প নেই।

সরকার ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে জানান, হিসাব করে দেখা গেছে, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি ৭ হাজার ২৪৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা কমে। আর পাইকারি মূল্য এক টাকা বাড়ালে ভর্তুকি ১০ হাজার ৩৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কমে। আর পাইকারি মূল্য ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি ১২ হাজার ৪১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা কমে। এখন মন্ত্রিসভা কমিটি যেই প্রস্তাব ভালো মনে করবে, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় ও ডলারের উচ্চমূল্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক কঠিন সময় পার করছে; যেখানে স্বস্তির চেয়ে অস্থিরতাই বেশি স্পষ্ট।

‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ছড়ালে দ্রুত বিচার

চট্টগ্রামে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ: তদন্তের আগে একতরফা দোষারোপ না করার অনুরোধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সরকারি সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নয়: বাস মালিক সমিতি

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে যা আছে (শেষ পর্ব)

শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের নাম পরিবর্তন

কুমিল্লায় ‎পরীক্ষাকেন্দ্রে এমপির লাইভ, শিক্ষা বোর্ড তাকিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তে

পরবর্তী সময়ে কী খাবেন গড নোজ: সংসদে স্পিকার

দুই দিন ভার্চুয়ালি চলবে বিচারকাজ, আইনজীবীদের আপত্তি

হজ ক্যাম্পে লাগেজ র‍্যাপিং সেবা চালু

সংসদের কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি