সকালে আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকলেও গতকাল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরে রোদের দেখা পেয়েছে কৃষক। স্বস্তির এই রোদে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত দিন কেটেছে তাঁদের। যদিও এই রোদের স্থায়িত্ব কম, তারপরও শেষ সম্বল ঘরে তুলতে বসে নেই চাষিরা। তবে হাওরাঞ্চলে রোদ উঠলেও আবার বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় শঙ্কা কাটেনি।
হাওরে বোরো ফলনের একটা অংশ আগেই জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে কাটা ধানে অঙ্কুর গজানোর অবস্থা হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা ছিল। শেষ পর্যন্ত রোদ ওঠায় ক্ষতি কিছুটা কমানো গেছে বলে দাবি কৃষকদের।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আগামী সোমবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে সারা দেশে। গতকাল সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামীকাল শনিবার দুপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
এদিকে হাওরে শ্রমিক-সংকট কাটাতে সব বালুমহাল বন্ধের নির্দেশনা আরও পাঁচ দিন বাড়ানো হয়েছে। ৫ মে পর্যন্ত এই নির্দেশনা বহাল থাকবে।
সরেজমিনে সুনামগঞ্জ-সাচনাবাজার সড়কসংলগ্ন ছনুয়ার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, রোদ ওঠায় কেউ স্তূপ করা ধান শুকিয়ে বস্তাবন্দী করছেন। কেউ ধান কাটছেন, কেউ ধান কেটে হাওরের উঁচু জায়গায় এনে স্তূপ করছেন।
ধান টেনে পাড়ে তুলছিলেন সাচনাবাজার ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের কৃষক মো. রইছ উদ্দিন এবং পলক গ্রামের কৃষক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। রোদে স্বস্তি প্রকাশ করে রইছ বলেন, ‘দিনটা ভালো, খরায় ধান কাটতে আইছি। অনেক জমি পানিতে তলাইছে। যেটুকু জাইগা আছে সেটুকু কাটার চেষ্টা করতাছি। এইভাবে রোদ দিলে অন্তত খানি-খোরাকের বোঝ তুলন যাইব। বৃষ্টি দিলে বউ-বাচ্চা লইয়া উপাস থাকন লাগব।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক আঙ্গুর মিয়া বলেন, সোনালি ফলন নষ্ট হতে দেখে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়েছে। রোদের দেখা পাওয়ায় সবার মনে আশা জেগেছে। যদিও পাগনা হাওরে ৬০ শতাংশ ধান কাটার বাকি, তারপরও সবাই ধান শুকানো ও কাটার কাজে মহাব্যস্ত। এ রকম রোদ দিলে জলমগ্ন ধান কাটতে মানুষ আগ্রহী হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরে গড়ে ৫০ দশমিক ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৮৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে এ পর্যন্ত। ১ লাখ ৯ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমির ধান কাটা এখনো বাকি আছে হাওরে।
রোদ উঠলেও সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি কমেনি, বরং বেড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এ পর্যন্ত হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান কাটা হয়েছে। রোদ ওঠায় কৃষকের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। দ্রুত ধান শুকানো থেকে শুরু করে কাটার বাকি অংশ তাড়াতাড়ি কাটতে হবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, বুধ ও বৃহস্পতিবার বৃষ্টি কম হওয়াটা স্বস্তির।
এদিকে কিশোরগঞ্জের হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোদ থাকায় কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে আগে মাড়াইয়ের পর স্তূপ করে রাখা ধান থেকে ইতিমধ্যে চারা গজিয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, মাড়াই করা কাঁচা ধান দ্রুত সময়ের মধ্যে শুকানো সম্ভব না হলে পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার শঙ্কা ছিল। সেটা কিছুটা কেটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, আগামী দুই-তিন দিন যদি বৃষ্টি না থাকে, তবে কৃষকেরা আশঙ্কামুক্ত থাকবেন। ঘরে ধান তুলতে পারবেন।
তবে নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, গতকাল আবহাওয়া ভালো ছিল। তবে আবারও বৃষ্টি হতে পারে।
সরেজমিনে মৌলভীবাজারের কেওলার হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর ও হাকালুকি হাওরে দেখা যায়, হাওরের ওপরের অংশে পানি কিছুটা কমে গেলেও বেশির ভাগ ধান পানিতে ডুবে আছে। পানি কমে যাওয়া অংশ থেকে কিছু কৃষক কষ্ট করে নৌকা দিয়ে ধান কাটছেন। তবে বেশির ভাগ কৃষক ধান কাটতে পারছেন না।
কেওলার হাওরের কৃষক শামিম আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ধান আরও দুই সপ্তাহ পর কাটার উপযোগী হবে। এর আগেই পানিতে ডুবে গেছে। পানি কমার পর ধান আর খুঁজে পাব না।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় ৮৬৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। অনেক স্থান থেকে পানি কমে গেছে। কৃষকেরা ধান কাটতে পারছেন।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, দ্রুত সময়ে জেলার নদীগুলোর পানি নেমে গেছে। নদীর পানি কমায় যেসব এলাকা প্লাবিত ছিল, এসব এলাকার পানি কমে গেছে। বৃষ্টি না হলে পানি বাড়ার আশঙ্কা নেই।
কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের পর গতকাল রোদের দেখা মিললেও নেত্রকোনার সব কয়টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রোদ থাকায় হাওরের কৃষকেরা ধান শুকানোর সুযোগ পেয়েছেন।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আরও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি]