আগামী ৫০ বছরেও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য (ময়মনসিংহ-৭) মাহবুবুর রহমান। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের উদ্দেশে বলতে চাই, আওয়ামী লীগ তিনটা জেনারেশনকে ইনজুরড করেছে। একটা হচ্ছে স্কুল, আরেকটা কলেজ, আরেকটা ইউনিভার্সিটি। এটা হলো নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন; পরে হাসিনার খেদাও আন্দোলন। এই তিনটা জেনারেশন আগামী ৫০ বছর জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বোধ হয় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।’
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন জানান, বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটা কতটুকু সুফল দিতে পারবে, সেটা তিনি জানতে চান। তিনি বলেন, ভ্যাটের প্রভাব সমানভাবে ধনী ও দরিদ্রের ওপরে পড়ে। এটা দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সাধারণ মানুষ, দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। এই বাজেটে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খুব একটা ভালো খবর নেই।
পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) বলেন, ‘বাজেটের সাফল্য আসলে এখানে টেবিল চাপড়ার ওপর নির্ভর করে না। বাজেটের সাফল্য নির্ভর করে আমাদের মাঠপর্যায়ের যাঁরা তৃণমূলে আছেন, বাজারবাসী আছেন, সেখানকার লোকদের মুখের হাসিতে।’
বাজেট উপস্থাপনার ধরন নিয়েও সমালোচনা করেন শফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, আধুনিক বিশ্বে বাজেট উপস্থাপনায় ইনফোগ্রাফিক, ভিজ্যুয়াল ড্যাশবোর্ড, তুলনামূলক চার্ট, সহজ টেবিল ও নাগরিক সংস্করণ থাকে; কিন্তু বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নে নাগরিক তো দূরের কথা, সংসদ সদস্যদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ কম।
হামে ৩০০ শিশু মারা গেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভেবেছেন কি না—স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ও বাস্তবতার ফারাক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শফিকুল ইসলাম। একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ‘নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক’; কিন্তু সে ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
এরপরই শফিকুল ইসলাম প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘৩০০ শিশু হামে মারা গেল, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের চিন্তা করেছেন কি না।’ ওই হাসপাতালের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার কথাও সংসদে তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ‘দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন’; সচিব, মহাপরিচালক বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, দুই লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মে মাসের বেতন এখনো দেওয়া হয়নি বলে তিনি শুনেছেন; এতে পরিবার চালানো থেকে চিকিৎসা পর্যন্ত তাঁরা সংকটে পড়েছেন।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমি শুধু এটাকে গরিব মারার বাজেট হিসেবে বলতে চাই না। এটা শুধু গরিব মারার বাজেট নয়। গরিবকে হয়রানির বাজেট।’ খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর শূন্য দশমিক দুই শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে কোটি কোটি খুচরা ব্যবসায়ী হয়রানির মুখে পড়বেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের বরাদ্দ কমানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে সালাহউদ্দিন বলেন, দুদকের গত বছরের বরাদ্দ ছিল ২০৩ কোটি টাকা; এবার রাখা হয়েছে ১৯৭ কোটি টাকা। তাঁর ভাষ্য, ছয় কোটি টাকা কম বরাদ্দ দিয়ে দুর্নীতিকে প্রমোট করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদক ‘অচল’ হয়ে গেছে এবং কমিশন পুনর্গঠন না হওয়ায় মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি শুরু হয়েছে। স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, খাল খনন ও এনবিআর নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও সংসদে তোলেন তিনি।
ময়মনসিংহ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন বাজেটকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাজেটের বইয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব থাকলেও তাঁর চোখে ভেসে ওঠে কৃষকের ঘামে ভেজা মুখ, শ্রমিকের ক্লান্ত হাত, মায়ের নির্ঘুম রাত ও শিক্ষিত তরুণের অপেক্ষা। তাঁর মতে, বাজেট শুধু অর্থনীতির দলিল নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক অঙ্গীকার।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ক্যানসার রোগের আগাম শনাক্তকরণে উপজেলা পর্যায়ে স্ক্রিনিং মেশিন দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, দেশে বছরে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন; অধিকাংশ রোগী দেরিতে শনাক্ত হন। পরিবারগুলোকে পাঁচ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। তাঁর প্রস্তাব, ক্যানসার রোগের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হোক এবং প্রতিটি উপজেলায় আগাম শনাক্তকরণের মেশিন বাধ্যতামূলক করা হোক।
ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিম বলেন, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততায় ভোলার বহু পরিবার বসতভিটা ও জীবিকার উৎস হারাচ্ছে। তাঁর নির্বাচনী এলাকার অন্তত ১০টি ইউনিয়ন নদীভাঙনের সরাসরি ঝুঁকিতে আছে। তিনি জাতীয় অ্যাগ্রিভোল্টাইক বা অ্যাগ্রিসোলার নীতি প্রণয়নের প্রস্তাব করেন। একই জমিতে কৃষি উৎপাদন ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য ও জ্বালানিনিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব বলে মত দেন তিনি।
ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ কুটির শিল্পকে সংগঠিতভাবে বাজারজাত করার জন্য একটি কুটির শিল্প বাণিজ্য মেলার প্রস্তাব করেন। জামদানি, মণিপুরি শাড়ি, টাঙ্গাইলের তাঁত, নকশিকাঁথাসহ দেশীয় কুটির শিল্পকে একই ছাতার নিচে আনার কথা বলেন তিনি।
চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বয়স্কদের জন্য বৈকালিক স্কুল চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, গ্রামের যে জনগোষ্ঠী শিক্ষার আলো পায়নি, তাদের নিরক্ষরতা দূর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, এতে মানুষ বুঝতে পারবে কোথায় ভোট দিতে হয়; কেউ তাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না।
বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টন বাজেটকে ‘ভবিষ্যৎমুখী’ ও ‘ঐতিহাসিক’ বলেন। তিনি বগুড়া, গাবতলী ও শাজাহানপুরের উন্নয়ন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের দাবি জানান।
রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, বাজেট নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে, তবে সমালোচনা হওয়া উচিত ‘পজিটিভ’। তিনি পদ্মা ব্যারাজকে ‘সিগনেচার প্রজেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা এর সুফল পাবে।
ময়মনসিংহ-১১ আসনের ফখরুদ্দিন আহমেদ বাজেটকে ‘কল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলে সমর্থন জানান। ভালুকার রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা চান তিনি।
ফেনী-২ আসনের জয়নাল আবেদিন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রবাসীকল্যাণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে খেতাববিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর দাবি জানান।