সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হবে নির্দলীয়। একই সঙ্গে প্রার্থীদের ভোটারের সমর্থনের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দেওয়ার বিধানও বাতিল হতে পারে। এসব কারণে নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই প্রার্থীর সংখ্যায় লাগাম টানতে জামানতের অর্থ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি বিধিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে ইসি। শিগগির খসড়া বিধিমালা ইসির ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হবে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করেছি প্রার্থীর জামানত বাড়ানোর। যাতে করে অযাচিতভাবে কেউ প্রার্থী হতে না পারে।’
স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিল করে আইন সংশোধন করেছে সরকার। যে কারণে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই নির্বাচন বিধিমালা ফরমেও পরিবর্তন আনছে ইসি। দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী হওয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিল করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তাতে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে মনে করছে ইসি। এতে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নানান জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্ভাব্য এই জটিলতার লাগাম টানতে ইসি জামানত বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। বর্তমানে দেশে ১৩ সিটি করপোরেশন, ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১ জেলা পরিষদ এবং ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে একটি অভিন্ন আচরণবিধির খসড়াও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বর্তমান নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনে স্বতন্ত্র মেয়রপ্রার্থী হতে ২৫০ ভোটারের সমর্থনের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা, পৌরসভার মেয়র পদে ১ শতাংশ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা জমা দিতে হয় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়।
কিন্তু নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে ভোটারের স্বাক্ষর যুক্ত করার বিধান বাতিলের পরিকল্পনা করছে ইসি। তাই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য আলাদা নির্বাচনী বিধিমালা পরিবর্তন করতে হবে ইসিকে। এরই মধ্যে ইসির আইন শাখাকে বিধিমালার খসড়া তৈরি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিটি খসড়া বিধিমালা নিয়ে বৈঠকে বসবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান তুলে দেওয়া হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনেকে প্রার্থী হয়ে যাবেন বলে ধারণা করছে ইসি। এতে করে ব্যালট বড় হওয়ার সঙ্গে ছাপানোর খরচ বেড়ে যাবে। ২৫-৩০ প্রার্থীর মধ্যে পছন্দের প্রার্থী বের করাও ভোটারদের জন্য সময়সাপেক্ষ হবে। স্থানীয় সরকারে ভোটারকে তিনটি পদে ভোট দিতে হয়। এতে ভোটের হারও কম পড়ার শঙ্কা আছে। এ ক্ষেত্রে জামানতের টাকা বাড়ানো হলে অযাচিত অনেকে প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত থাকবেন বলে মনে করে ইসি।
ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তাই যোগ্য কাউকে প্রার্থী হতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায় না। কিন্তু জামানত কম থাকলে অনেকে প্রার্থী হয়ে যাবেন। পাস-ফেলের বিষয়ে পাত্তা দেবেন না তাঁরা। হয়তো কিছু পোস্টার ছাপাবে। এতে ইসির খরচ বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে ইসির পরিকল্পনা জামানত বাড়িয়ে দেওয়ার। তবে সেটা এমনভাবে বাড়ানো হবে না, যাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
জামানত বাড়ানোর বিষয়ে ইসি অংশীজনদের মতামত নেওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে জানিয়েছেন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে বিধিমালাটা তৈরি করি। তারপর ওয়েবসাইটে খসড়া দেওয়া হবে। সেখানে সকলেই মতামত দিতে পারবে। প্রয়োজন মনে করলে আমরা অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করব।’
বর্তমানে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জামানত ৫ হাজার এবং সদস্যদের জামানত ১ হাজার টাকা। উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জামানত ১০ হাজার টাকা। পৌরসভার ভোটার ২৫ হাজারের কম হলে মেয়র পদে জামানত ১৫ হাজার, ২৫-৫০ হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে জামানত ২০ হাজার, ৫০ হাজার-১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে জামানত ২৫ হাজার এবং ১ লাখের বেশি ভোটার থাকলে জামানত ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়।
আর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে ৫ লাখ ভোটারের নির্বাচনী এলাকার জামানত ২০ হাজার টাকা। একইভাবে ভোটার ৫ লাখ ১ থেকে ১০ লাখের ক্ষেত্রে জামানত ৩০ হাজার, ভোটার ১০ লাখ ১ থেকে ২০ লাখ হলে ৫০ হাজার এবং ভোটার ২০ লাখের বেশি হলে ১ লাখ টাকা জামানত দিতে হয়।
এর মধ্যে হাবিবুল আউয়াল কমিশন ২০২৪ সালের মার্চ মাসে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালা সংশোধন করে। সেখানে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের জামানত বাড়ানো হয়। চেয়ারম্যানের জামানত ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ এবং ভাইস চেয়ারম্যানদের জামানত ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা করা হয়।
সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জামানত বাড়ানোর ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা অনুসরণ করা হতে পারে।