অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার রোধে সরকার, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা। তাঁরা বলছেন, ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহের গতি বাড়লেও এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি বাড়ছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আজ রোববার আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। সভা সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, অপতথ্য মোকাবিলায় কেবল আইন নয়, বরং জনগণের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো জরুরি। মানুষকে তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা দিতে না পারলে অপতথ্যের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব পক্ষের অংশগ্রহণে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নীতিমালা ও ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তথ্যমন্ত্রী। বলেন, এবারে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিন্দু তৈরি করেছে। এই যাত্রাকে দৃশ্যমান করতে তথ্য মন্ত্রণালয় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, সংবিধানে বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যম—এই দুই পেশার স্বাধীনতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে। তিনি সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক কোড অব কনডাক্ট প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানান।
দেশে অপতথ্য এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেন নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি মোকাবিলায় কেবল আইন নয়, প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন। বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সত্য সংবাদ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানুষ যাচাই ছাড়াই তা বিশ্বাস করছে।
মতিউর রহমান চৌধুরী আরও বলেন, এখন প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতেই মোবাইল, ফলে ‘ঘরে ঘরে সাংবাদিক’ তৈরি হয়েছে। কেউ কিছু দেখলেই তা যাচাই না করেই প্রকাশ করছে, যা সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ না হলে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—কেউই নিরাপদ থাকবে না। এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু সরকার নয়—গণমাধ্যম, সাংবাদিক, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ জনগণকে নিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন নোয়াব সভাপতি। এ ছাড়া তিনি সুপ্রিম কোর্টে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে দ্রুত বিবৃতি আহ্বান জানাই।’
সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নূরল কবীর বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যে কার্যকর সম্পৃক্ততা জরুরি। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
নুরুল কবির নতুন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়ার পরিবর্তে পূর্বের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে কমিশনের কথা শুনতে চাই না। বরং আগের কমিশনগুলোর সুপারিশ থেকে সরকার কোনগুলো বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত—সেটি স্পষ্ট করা দরকার।’
কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এখন সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি—সব পর্যায়ের জন্যই গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ, অপতথ্য ও নৈতিক অবক্ষয় মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।’
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকেরা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ৮৫ শতাংশের বিচার হয় না। তিনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপতথ্য মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, গণমাধ্যম কমিশনের যে সুপারিশ তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপেস সম্পাদক শামসুল হক জাহেদ বলেন, বাংলাদেশে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা কখনোই ছিল না এবং ভবিষ্যতেও তা নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকাংশে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ওপর নির্ভরশীল, পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এতে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যম বর্তমানে যে চাপে রয়েছে, তার একটি বড় কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান। তার ভাষায়, ‘সোশ্যাল মিডিয়া এক ধরনের সীমাহীন স্বাধীনতা ভোগ করে, কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমকে নানা বিধিনিষেধ ও দায়বদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়।’
ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের মানোন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো জরুরি বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ যেন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে, সে জন্য শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, বিগত সরকারের সময় স্বাধীন সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এই সরকারের বয়স মাত্র দুই মাস, এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, বর্তমানে গণমাধ্যমের একটি বড় জায়গা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এখানে অনেক সময় অপতথ্য, ভুল তথ্য বা সত্য-মিথ্যের মিশেল দিয়ে প্রচার করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের পলিসি তৈরি করা প্রয়োজন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, মূলধারার গণমাধ্যম নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার বিভাজন স্পষ্ট না থাকাও একটি বড় সমস্যা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি শক্তিশালী নৈতিক নীতিমালা (ইথিক্যাল কোড) প্রণয়ন জরুরি।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিমসহ অনেকে।