দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের মাত্রা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ।
আজ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এ তথ্য তুলে ধরে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪৮ হাজার ৭১৩ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৩২৮ জন, যা মোট শিক্ষার্থী নিহতের ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
অন্যদিকে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৩৬ জন, যা মোট শিক্ষার্থী নিহতের ৫৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে শিক্ষার্থী নিহতের ধরন তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৯২৩ জন (২৬ দশমিক ১১ শতাংশ)। যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ৯২৭ জন (১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ)। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ জন (৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ)। বাইসাইকেল ও রিকশার আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছে ৫১৯ জন (৭ দশমিক ০৪ শতাংশ)। অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে নিহত হয়েছে ১৫৪ জন (২ দশমিক ০৯ শতাংশ)।
সড়কভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মহাসড়কে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৪৮২ জন (২০ দশমিক ১২ শতাংশ)। আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ১৪৯ জন (২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ)। শহরের সড়কে ১ হাজার ৭৮৬ জন (২৪ দশমিক ২৫ শতাংশ)। গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৪৭ জন (২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ)।
পথচারী হিসেবে নিহত ১ হাজার ৯২৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কে নিহত ২৫১ জন (১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ)। আঞ্চলিক সড়কে ৪০৯ জন (২১ দশমিক ২৬ শতাংশ)। শহরের সড়কে ৫৩৭ জন (২৭ দশমিক ৯২ শতাংশ)। গ্রামীণ সড়কে ৭২৬ জন (৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ)।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং বাড়ির আশপাশে খেলার সময় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় বেশি নিহত হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা গ্রামীণ সড়কে বেশি ঘটেছে।
১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এসব দুর্ঘটনা আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে বেশি ঘটেছে।
এ ছাড়া বাইসাইকেল আরোহীরা থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল ও অনিরাপদ মালবাহী যানবাহনের ধাক্কায় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে বেশি নিহত হয়েছে।
অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে দুর্ঘটনার জন্য ব্যক্তিগত অসতর্কতাকে দায়ী করেছে সংস্থাটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, গত সাড়ে সাত বছরে অসাবধানে রেললাইন পারাপারের সময় এবং কানে হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে আরও ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, অনিরাপদ যানবাহন, সচেতনতার ঘাটতি, সড়ক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের অভাব, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা শিক্ষার্থী মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এ সমস্যা কমাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ক্যাম্পেইন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্তি, অনিরাপদ যানবাহন বন্ধ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে অভূতপূর্ব অহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
সংস্থাটির ভাষ্য, সেই ঘটনার আট বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং সড়ক দুর্ঘটনাও নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
তাদের মতে, সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অনেকটাই অবৈজ্ঞানিক ও সমন্বয়হীন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন খাতের স্বার্থবাদী গোষ্ঠী নিজেদের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির স্বার্থে সড়কে বিশৃঙ্খলা বজায় রাখছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কমিটি গঠন ও সুপারিশ তৈরি করা হলেও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। ফলে কমিটি গঠন ও সুপারিশ তৈরির মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।