দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধান করেছে; যা দুদক প্রতিষ্ঠার পর এক বছরে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র দাখিল এবং সম্পদ জব্দ করার ক্ষেত্রেও গত বছর রেকর্ড গড়েছে কমিশন।
অবশ্য অনুসন্ধানের রেকর্ডকে দুদকের সাফল্যের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখার বিপক্ষে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, সংস্থাটি কতটা প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করছে, সেই প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দুদকের সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটিতে ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে আমলযোগ্য ২ হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন, যা মোট অভিযোগের প্রায় ১৮ শতাংশ। ২০০৪ সালে দুদক গঠনের পর থেকে বছরে গড়ে মোট অভিযোগের ৪ থেকে ৫ শতাংশ অনুসন্ধান করেছে সংস্থাটি।
২০২৪ সালে দুদক প্রথমবারের মতো এক বছরে হাজারের বেশি অভিযোগ অনুসন্ধান করেছিল। ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ও পরে মিলিয়ে ১৫ হাজার ৮৪২টি অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯৪টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা মোট অভিযোগের ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকের মধ্যে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় প্রায় ৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়। ২০২৪ সালে দুদক এর আগে সর্বোচ্চ ৪৫১টি মামলা করেছিল। ২০২৩, ২০২২, ২০২১ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৩৪৮, ৩৪৭, ৪০৬ ও ৪০৪টি মামলা করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দুদক ৪১৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে। ৮৯টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪৭টি অভিযোগ সমাপ্ত এবং ৪৩২ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়। ২০২০ সালে ২২৮টি, ২০২১ সালে ২৬০টি, ২০২২ সালে ২২৪টি, ২০২৩ সালে ৩৬৩টি, ২০২৪ সালে ৪০৩টি মামলার অভিযোগপত্র দেয় সংস্থাটি। গত বছর নিষ্পত্তি হওয়া দুদকের মামলায় সাজার হার বেড়ে হয় ৫২ শতাংশ। ২০২৪ সালে এর হার ছিল ৪৮ শতাংশ।
গত বছর অবৈধ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও আগের সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে দুদক। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ৩৭০টি আবেদনের ভিত্তিতে অবৈধভাবে অর্জন এবং বিদেশে পাচার হওয়া ২৯ হাজার ৩১০ কোটি ১২ লাখ ৭ হাজার ১৫৩ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৩৭ কোটি ২২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৭ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ২৩ হাজার ১৭২ কোটি ৭৮ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯৬ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ
করা হলে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের ‘মেরিট’ অনুযায়ী দুদক ব্যবস্থা নেয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করা হয় না।
গত বছর দুদকের করা মামলা, অনুসন্ধান, অভিযোগপত্র ও সাজার হার বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংস্থাটির লিগ্যাল শাখার সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, দুদকের জন্মই হয়েছে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে। মামলা করা, অভিযোগপত্র দেওয়া ও সাজার হার বৃদ্ধি মানে দুদক কাজ করছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যাদের অপরাধ প্রমাণিত হবে তাদের যথাযথভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, শুধু অভিযোগ অনুসন্ধানের হার বৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে দুদকের সাফল্য নিরূপণ করা সমীচীন হবে না। কারণ, বিগত বছরটি বিভিন্ন মানদণ্ডে দুদকের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় ছিল ব্যতিক্রমী। কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্রের পতনের পর দুদক খুব সহজ ও সাবলীলভাবে পতিত শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করতে তৎপর হয়েছে। তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুদক কতটুকু প্রভাবমুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। কর্তৃত্ববাদ-পরবর্তী মেয়াদেও দুদক তার জন্মলগ্ন থেকে প্রতিপালিত চর্চা অব্যাহত রেখে ক্ষমতাসীনদের বাইরে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের ক্ষেত্রেই তৎপরতার পাশাপাশি যাঁরা ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতায় আসন্ন তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রেখেছে। যেসব মামলা বা তদন্ত বর্তমানে চলমান সেগুলোর চূড়ান্ত ফল কী হয়, সেটাও দেখার বিষয়।