২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো হুনজা উপত্যকায় ভ্রমণ জাভেরিয়া আনোয়ারের জীবনে একটি বড় পরিবর্তন এনে দেয়। গিলগিট-বাল্টিস্তান অঞ্চলের পর্বতময় ওই এলাকাটির মোহময় নদী আর আকাশ ছোঁয়া পাহাড় তাঁর মনকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। এভাবেই প্রথমবার দেশীয় পর্যটনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পাকিস্তানের লাহোরে বসবাস করা ৩৬ বছর বয়সী এই নারীর।
সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার এক বছর পরই একটি পর্যটন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হন জাভেরিয়া। একজন নারী গাইডের খোঁজ করছিল প্রতিষ্ঠানটি। দায়িত্ব পেয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহর থেকে আসা ডজন খানেক পর্যটক নিয়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত ভ্যালিতে যাত্রা করেন তিনি। সেখানে পর্যটন অবকাঠামো সীমিত ছিল, তবে পাইন বন, স্বচ্ছ আকাশ ভরা তারা এবং জঙ্গলের নিস্তব্ধতা পর্যটকদের মনকে উদ্বেলিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তারপর থেকেই দেশীয় ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে টানা কাজ করছেন জাভেরিয়া। এর মধ্যে তিনি লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইড হয়েছেন এবং বিদেশি পর্যটকদেরও পাকিস্তানের নানা প্রান্তে নিয়ে গেছেন। চীনা সীমান্তের নিকটবর্তী আলপাইন হ্রদ থেকে শুরু করে পাঞ্জাবের হিন্দু মন্দির ও সিন্ধুর শুষ্ক দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশের বিশাল সমাধিক্ষেত্র—সব জায়গায় পর্যটকদের নিয়ে গেছেন তিনি।
এখন তিনি পাকিস্তানে পর্যটন পুনর্জীবনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন নারীদের একটি ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীর অংশ। দেশটির পর্যটন শিল্পে নারী গাইড ও উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে।
জাপানভিত্তিক ‘নিক্কেই এশিয়া’ জানিয়েছে, ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে পাকিস্তান হিপ্পি ট্রেইলের একটি জনপ্রিয় স্টপ ছিল। মূলত স্থলপথ ধরে পশ্চিমা তরুণ হিপ্পিদের কাছে এই ট্রেইল ছিল আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি এবং মাদক খোঁজার একটি অভিযাত্রা। তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে শুরু হয়ে ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারত ও নেপালের কাঠমান্ডু পর্যন্ত এই পথের বিস্তৃত ছিল। তবে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও সীমান্ত কঠোরতা সেই যুগের অবসান ঘটায়। পরবর্তী কয়েক দশকে পাকিস্তানের পর্যটন শিল্প নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং খারাপ অবকাঠামোর কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। বিশ্বের ১৪টি উচ্চতম শিখরের মধ্যে পাঁচটিই পাকিস্তানে। এ ছাড়া সুসংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান এবং সমৃদ্ধ স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য পাকিস্তান আবারও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ২০ লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। মোট দেশজ উৎপাদনের ৫.৮ শতাংশ অবদান এসেছে পর্যটন শিল্প থেকে। শুধু বিদেশি নয়, দেশি পর্যটকেরাও এতে ভূমিকা রেখেছেন। আর পাকিস্তানের নারীরাই এই পুনর্জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কেউ গাইড, আবার কেউ ভ্রমণকারী হিসেবে অবদান রাখছেন।
পাকিস্তানের হুনজা ভিত্তিক ভ্রমণ কোম্পানি ‘রুট ১৬ ’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সোবিয়া মক জানান, কোভিড-১৯ মহামারির সময় আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ হওয়ার পর ঘরোয়া পর্যটন বেড়ে গিয়েছিল। দেশি পর্যটকেরা হুনজা উপত্যকায় পৌঁছে শুধু দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক দৃশ্যই দেখেন না, বরং একটি অনন্য নিরাপত্তা অনুভব করেন। সোবিয়া নিজেও বহু জায়গায় ভ্রমণ করেছেন এবং হুনজাকে বিশ্বের নিরাপদতম স্থানগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২০২২ সালের বসন্তে চেরি ও অ্যাপ্রিকট ফুলের সৌন্দর্য দেখার সময় সোবিয়া নারী ভ্রমণকারীদের মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘যে নারীরা বড় শহর বা বিদেশ থেকে এসেছেন, নিরাপত্তা নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল কল্পনাতীত। নিরাপদ মনে করলেই নারীরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভ্রমণ করতে শুরু করেন।’
হুনজা উপত্যকায় বুরুশো ও ওয়াখি সহ একাধিক জাতির বসবাস। সমীক্ষা অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে অপরাধের হার প্রায় শূন্য এবং নারী-পুরুষ উভয়ের সাক্ষরতার হার ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত, যা দেশটির জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনো বিশ্বে নিম্নমুখী, কিন্তু নারী গাইড ও উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি তাঁদের মানসিক বাধা ভাঙতে সাহায্য করছে।
নারীদের জন্য নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা প্রদানকারী নারী হোস্ট এবং গাইডরা নতুন নারীদের ভ্রমণে উৎসাহ দিচ্ছেন। সোবিয়া মক বলেন, ‘এটি নারীদের নেতৃত্বাধীন পর্যটনের একটি ধারা তৈরি করছে, যা নারীর ভ্রমণকে আরও উদ্দীপ্ত করছে। আরও নারীর ভ্রমণ মানে আরও নারী-নেতৃত্বাধীন স্থান তৈরি।’
এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির মধ্যে দেশটির একক আয়ের পরিবারগুলো পর্যটন শিল্পে বিকল্প আয়ের সন্ধান করছে। হুনজা উপত্যকার গুলমিতে অনেক নারী এখন কফি হাউসও পরিচালনা করছেন।
তবে বাধা এখনো আছে। সিন্ধুর মিরপুর খাস অঞ্চলের গাইড ও ইউটিউবার মিসা তালপুর ২০১৬ সালে প্রথম একা একা দেশের উত্তরাঞ্চলে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন। মা ছাড়া সে সময় তাঁকে আর কেউই সমর্থন করেননি। সামাজিক সেই অবস্থা পরিবর্তন করার জন্য তিনি ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করেছিলেন। সেই মিসা এখন একটি মাউন্টেন হোমস্টে পরিচালনা করছেন।
জাভেরিয়া আনোয়ার বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরুষদের মনোভাব। তারা শক্তিশালী, স্বাধীন নারীর নেতৃত্ব মানতে চায় না।’
তবে পাকিস্তানের পর্যটনে নারীদের ওই এগিয়ে আসা দেশটিকে নতুনভাবে দেখা ও ভ্রমণের অনন্য সুযোগ প্রদান করছে।