হোম > জীবনধারা > ভ্রমণ

দেবতাখুমের নীরবতায়

মীর মহিবুল্লাহ

ছবি: আজকের পত্রিকা

বিদায়ী বছরকে স্মরণীয় রাখতে আমাদের যাত্রা ছিল বগা লেক ও কেওক্রাডং। পাহাড়, মেঘ ও নীল পানির সেই দিনগুলো পেছনে ফেলে বান্দরবানে ফেরার পথে হঠাৎ থমকে গেল মন। হাতে তখনো পুরো দিন, শনিবার সাপ্তাহিক ছুটিও রয়েছে। আজই ঢাকায় ফিরতে মন চাইছে না। ইট-পাথরের শহরে ফেরার চেয়ে গহিন অরণ্যের কোলে আরেকটি রাত কাটানোই যেন অনেক বেশি অর্থবহ। সেই ভাবনা থেকে হঠাৎ বদলে গেল সিদ্ধান্ত, আমরা যাব দেবতাখুম।

দুই পাথুরে পাহাড়ের মাঝখানে প্রায় ৪০০ মিটার দীর্ঘ স্বচ্ছ এক জলধারা দেবতাখুম। নিরাপত্তার কারণে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবারও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দশজনের দলে বগা লেক কেওক্রাডং গিয়েছিলাম, ফেরার পথে সাতজন বিদায় নিয়েছে। এই দুই দিনের সঙ্গীরাই কখন যে পুরোনো দিনের বন্ধুর চেয়ে আপন হয়ে উঠেছে, টের পাইনি। কিছুটা খারাপ লাগা বুকের ভেতর জমিয়েই তিনজন ছুটে চললাম সিএনজিচালিত অটোরিকশাস্ট্যান্ডের দিকে।

দেবতাখুম বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। রোয়াংছড়ি পর্যন্ত সড়কপথে সহজে যাওয়া যায়। তবে রোয়াংছড়ি গিয়ে কচ্ছপখালী এলাকায় যেতে হবে, সেখান থেকে দেবতাখুম পৌঁছাতে হলে কিছুটা পথ ট্রেকিং করে যেতে হয়। বান্দরবান থেকে এক ঘণ্টার অটোরিকশা-যাত্রা শেষে সরাসরি আমরা পৌঁছালাম কচ্ছপখালী। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গেছে। কচ্ছপখালী বাজার এলাকায় বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি পাহাড়ি হোটেল চোখে পড়ল। আজ আর বান্দরবান ফিরতে ইচ্ছা করছে না, তাই রাত যাপনের জন্য একটি ঘর ঠিক করে নিলাম। দুপুরের খাবার সেরে এবার দেবতাখুমের উদ্দেশে রওনা হলাম।

তবে যাওয়ার আগে অবশ্যই সঙ্গে নিতে হয় একজন গাইড।

গাইডের পেছনে হাঁটা শুরু। দেবতাখুম যাওয়ার দুটি পথ—সড়কপথ ও ঝিরিপথ। আমরা বেছে নিলাম ঝিরিপথই। এই পথের সৌন্দর্য ভাষায় ধরা কঠিন। উঁচু উঁচু পাহাড় দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে পাহারার মতো, তাদের বুক ঘেঁষে নীরবে বয়ে চলেছে তারাছা খাল। দুপাশে পাহাড়িদের বসতি আর চারদিকে এক গভীর পাহাড়ি নীরবতা। খালের স্বচ্ছ পানিতে পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এ যেন আগন্তুকের জন্য স্বর্গের পথে যাত্রা।

প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছালাম শীলবান্ধা পাড়ায়। ঘনবসতিপূর্ণ এই পাড়ায় স্থানীয়দের বাড়ির পাশাপাশি পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য তৈরি হয়েছে টংদোকান। এখান থেকে নিচে নামতেই চোখে পড়ল টিকিট কাউন্টার। জনপ্রতি ২০০ টাকায় টিকিট। এই টিকিটে রয়েছে লাইফ জ্যাকেট, নৌকা পারাপার আর ভেলায় ঘোরাঘুরির সুযোগ। টোকেন হাতে নিয়ে এগিয়ে চললাম মূল লক্ষ্যের দিকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, অনেক দর্শনার্থী ফিরছেন আর আমরা চললাম ঠিক উল্টো পথে।

খাদ পারাপারের জন্য নৌকার সিরিয়াল। মাঝির সঙ্গে কথোপকথন করতেই পার হলাম সেই অংশ। নৌকা থেকে নামতেই আবার ভেলার অপেক্ষা এক অনিবার্য ধৈর্যের পরীক্ষা। দায়িত্বরতরা জানালেন, নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর শুরুতে প্রতিদিন হাজার ছুঁই ছুঁই পর্যটক এসেছেন। ভেলায় উঠতে উঠতেই অনেকের নাকি সন্ধ্যা নেমে গেছে। আজ ভাগ্য সুপ্রসন্ন, পর্যটক থাকলেও সিরিয়াল পেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না।

কয়েকখানা বাঁশ জুড়ে দিয়ে তৈরি ভেলা কোনোটায় একজন, কোনোটায় দুজন। চালাতে হয় নিজেকে। তবু বাঁশের ভেলায় ভাসা ছাড়া দেবতাখুম যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তিনজন তিনটি ভেলায় উঠলাম। প্রায় ৭০ ফুট গভীর খুম পড়ে যাওয়ার ভয় আজ নেই। তীরহারা মাঝির মতো ভেসে চললাম। চারদিকে টলমলে পানি, তার বুকে সন্ধ্যার গূঢ় আলো ঝিকিমিকি স্বপ্ন আঁকে।

ভেলার বাঁশে আঙুল বোলাতে বোলাতে বুঝি, এই ভ্রমণ শুধু চোখে দেখা নয়, এ এক অন্তরের যাত্রা। দেবতাখুম আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় নিজের ভেতরের গভীরে, যেখানে ভয় নেই, তাড়া নেই—শুধু নির্ভার থাকা। শেষবারের মতো পেছনে তাকালে খুম নীরবে তাকিয়ে থাকে, যেন বলে—আবার এসো।

লাল কাপড়ের ওপারে না হোক, অন্তত এই নীরবতার কাছে।

সন্ধ্যা নামলে পাহাড় বেয়ে উঠে পড়ি রাস্তায়। চারপাশে অন্ধকার, দূরে শিয়ালের ডাক। হঠাৎ পর্যটকবোঝাই একটি চান্দের গাড়ি থামে। ইশারায় ডাকতেই থেমে যায়। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই কচ্ছপখালী বাজারে। পাহাড়ের কোলে আরেকটি রাত, আরেকটি স্মৃতি জমা রেখে খুব ভোরে অটোরিকশায় ফিরি শহরের পথে।

কখন যাবেন

দেবতাখুম সব সময় যাওয়া যায়, তবে একেক সময় এর দৃশ্য একেক রকম হয়। বর্ষাকালে পানিপ্রবাহ বেশি থাকে, তাই যাত্রা কষ্টসাধ্য হয়। ঝিরিপথে ট্রেকিংও উপভোগ করা যায় না, আর পানির রংও অস্বচ্ছ থাকে। শীতকালে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় যাত্রা সহজ এবং খুমের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট দেখা যায়। দেবতাখুমসহ বান্দরবানের খুমগুলো দেখতে আদর্শ সময় হলো নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস।

কোথায় থাকবেন

ঢাকা থেকে বান্দরবান নেমে এক দিনেই ঘুরে আসতে পারবেন দেবতাখুম। অধিকাংশ পর্যটক বান্দরবান ফিরে এসে রাত যাপন করেন। তবে কেউ দেবতাখুম এলাকায় রাত যাপন করতে চাইলে কচ্ছপখালী বাজারে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি বেশ কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন, সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে খাবার জন্য ওদের আলাদা টাকা দিতে হবে, চাইলে আপনি প্যাকেজও নিতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বান্দরবান নেমে দেবতাখুমের ট্রিপ শুরু করতে হলে প্রথমে রোয়াংছড়িতে কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্প পৌঁছাতে হবে। বান্দরবান থেকে রোয়াংছড়ি প্রতি ঘণ্টায় বাস চলে এবং ভাড়া ৬০ টাকা। রোয়াংছড়ি পৌঁছে অটোরিকশায় সহজে কচ্ছপতলী যাওয়া যায়। চাইলে পুরোটা আরও আরাম করে, বান্দরবান থেকে জিপ, চান্দের গাড়ি ও অটোরিকশা রিজার্ভ করে সরাসরি কচ্ছপতলী যাওয়া সম্ভব। নিজস্ব গাড়ি নিয়েও আসতে পারবেন।

ভ্রমণ সতর্কতা

  • কচ্ছপখালী গিয়ে আর্মি ক্যাম্পে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি লাগবে। তারপরই দেবতাখুমে ঢুকতে পারবেন।
  • অবশ্যই সঙ্গে গাইড নিতে হবে।
  • কচ্ছপখালীতে গিয়ে গ্রামীণফোনে নেটওয়ার্ক পাবেন না। দেবতাখুম এলাকায় কোনো নেটওয়ার্কই পাবেন না।
  • ট্রেকিং করার জন্য প্লাস্টিক অথবা রাবারের জুতা পরতে পারেন। কারণ, ঝিরিপথে খালের পানিতে পা ভেজাতে হবে।
  • খুমে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরবেন।
  • সাঁতার না জানলে পানিতে নামা ঠিক হবে না। এ ছাড়া পানির নিচে বিশাল বিশাল পাথরখণ্ড রয়েছে।

এক দিনের ভ্রমণে ঘুরে আসুন মানিকগঞ্জ

দুবাইয়ে চালু হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু হোটেল ‘সিয়েল টাওয়ার’

বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে পাসপোর্ট শক্তির উত্থান-পতন

এ বছরের সেরা ৫ হানিমুন গন্তব্য

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি যেভাবে প্রভাব ফেলছে বিশ্ব পর্যটনে

এশিয়ায় নির্ভয়ে ঘোরার নতুন ঠিকানা জাপান

২৭ বছর হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ

হাকালুকির হিজল বনে

বাংলাদেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হাবিপ্রবির নেপালি শিক্ষার্থীরা

তেত উৎসবে ঘুরে আসুন ভিয়েতনামে