বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনের যুগে ‘নতুন’ আর ‘আধুনিক’ শব্দ দুটির আবেদন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাই বলে কি পুরোনো জিনিসগুলো হারিয়ে যায়? আমাদের এই পৃথিবীতেই টিকে রয়েছে অত্যন্ত প্রাচীন কিছু জীবন্ত অলৌকিক সত্তা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই জীবনগুলো পৃথিবীর বুকে আবহমান কালের জীবন্ত সাক্ষী। আপনি যদি ইতিহাস ও ভ্রমণের রোমাঞ্চ একসঙ্গে পেতে চান, তবে অতীতের এই ১০ জন ‘জীবন্ত রাষ্ট্রদূত’ আপনাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে।
‘উইজডম’ নামের এক স্ত্রী লেসান অ্যালবাট্রস পাখি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর প্রাচীনতম নিশ্চিত বন্য পাখি। যুক্তরাষ্ট্রের নোয়া সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৬ সালে জীববিজ্ঞানী চ্যান্ডলার রবিন্স যখন তাকে শনাক্তকরণ ব্যান্ড পরিয়ে দেন, তখন সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রজননক্ষম পাখি ছিল। উইজডমের বয়স বর্তমানে অন্তত ৭৫ বছর। প্রশান্ত মহাসাগরের মিডওয়ে অ্যাটল দ্বীপে প্রতি শীতে সে তার প্রজননস্থলে ফিরে আসে। দীর্ঘ জীবনে উইজডম তিন মিলিয়ন মাইলেরও বেশি উড়াল দিয়েছে। এই সময়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে প্রায় ছয়বার আসা-যাওয়া করা যায়।
দক্ষিণ আটলান্টিকের দুর্গম সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বাস করা অলডাব্রা প্রজাতির দৈত্যাকার কচ্ছপ জোনাথন। তার বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। ১৮৩২ সালে জন্ম নেওয়া এই কচ্ছপটি পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত ডাঙার প্রাণী। সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, তার বিশেষ জিনে ডিএনএ মেরামত ও প্রদাহ কমানোর অসামান্য ক্ষমতা রয়েছে। সেখান থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মানুষের আয়ু বৃদ্ধির গবেষণায় নতুন আশা দেখাচ্ছে।
জার্মানির হিল্ডেশাইমে অবস্থিত সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রালের গায়ে বেয়ে ওঠা এক বনগোলাপ থাউজেন্ড ইয়ার রোজ। বিশ্বাস করা হয় যে ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা লুডভিগ দ্যা পিউস এটি রোপণ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় পুরো ক্যাথেড্রাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, এই গোলাপ গাছটির মূল অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। আজ এটি ৩০ ফুটেরও বেশি উঁচুতে অবস্থান করছে।
শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরে অবস্থিত জয়া শ্রী মহা বোধি ডুমুর প্রজাতির একটি পবিত্র অশ্বত্থ গাছ। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে বুদ্ধের মূল বোধিবৃক্ষের একটি শাখা সেখানে নিয়ে রোপণ করা হয়েছিল। এটিই মানব ইতিহাসে হাতে রোপণের নথি থাকা সবচেয়ে প্রাচীন জীবিত বৃক্ষ।
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে ভুভেস গ্রামে অবস্থিত এই জলপাই গাছটি আজ থেকে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ বছর আগে জন্ম নিয়েছিল। আজও প্রতি বছর এই গাছ থেকে জলপাই উৎপন্ন হয়। এর প্যাঁচানো বিশাল গুঁড়ি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারী ও অলিম্পিয়ানদের আকর্ষণ করে।
পেরু, বলিভিয়া ও চিলির দুর্গম আন্দিজ পর্বতে দেখা মেলে ‘ইয়ারেটা’ নামক উজ্জ্বল সবুজ রঙের এক ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অত্যন্ত ধীরগতিতে বাড়ে। এই উদ্ভিদগুলো শতাব্দীতে মাত্র ১ মিটার করে লম্বা হয়। এরা কোনো কোনোটা প্রায় তিন হাজার বছর ধরে হিমশীতল বাতাস ও প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে টিকে আছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার হোয়াইট মাউন্টেনসের গভীর অরণ্যে লুকিয়ে রয়েছে ‘মেথুসেলাহ’ নামের এক ব্রিসলকন পাইন গাছ (Pinus longaeva)। এটি ক্লোনহীন একক প্রাণী হিসেবে পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত উদ্ভিদ (বয়স প্রায় ৫,০০০ বছর)। সুরক্ষার স্বার্থে এর আসল অবস্থান গোপনীয় রাখা হলেও মাউন্টেনের ইনয়ো ন্যাশনাল ফরেস্টে গেলে এদের সারি দেখা যায়।
অ্যান্টার্কটিকার কনকনে হিমশীতল সাগরের গভীর পানিতে বাস করে আগ্নেয়গিরি স্পঞ্জ অ্যানক্সিকেলিক্স জুবিনি। দানবাকৃতির বিয়ার ব্যারেল বা ছোট্ট আগ্নেয়গিরির মতো দেখতে এই স্পঞ্জগুলো প্রতি বছর খুব সামান্যই বাড়ে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন এদের কিছু স্পঞ্জের বয়স প্রায় ১৫ হাজার বছর।
আমেরিকার ইউটাতে অবস্থিত পান্ডো নামের একটি ট্রেম্বলিং অ্যাস্পেন অরণ্যে প্রায় ৫০,০০০ গাছ রয়েছে। কিন্তু জেনেটিক্যালি এই বিশাল অরণ্যের প্রতিটি গাছ একই মূল বা শিকড় ব্যবস্থা ভাগ করে নেয়। এর ফলে গাছগুলো একটিমাত্র একক জীবন্ত প্রাণীতে পরিণত হয়। ১০০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্লোনাল কলোনিটির বয়স প্রায় ৮০ হাজার বছর।
স্পেনের ফরমানতেরা দ্বীপের কাছে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে প্রায় ১০ মাইলজুড়ে বিস্তৃত সি-গ্রাস মেডো বা ‘নেপচুনস গ্রাস’। জিনতাত্ত্বিকদের মতে, পান্ডোর মতোই এটি নিজেকে ক্লোন করে বেঁচে রয়েছে এবং পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন একক জীবিত প্রাণী, যার বয়স প্রায় ২ লাখ বছর।
সূত্র: সিএনএন