হোম > জীবনধারা > সোশ্যাল মিডিয়া

ইটিং ডিজঅর্ডার: কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ফাঁদ

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 

সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাসে মারাত্মক বিচ্যুতি বা ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’-এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ছবি: ফ্রিপিক

বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রার ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তারকারী এক শক্তি। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এটি। তবে এই রঙিন দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে অনেক অন্ধকার দিক। তার মধ্যে একটি হলো ইটিং ডিজঅর্ডার।

সোশ্যাল মিডিয়া নিজে কোনো রোগ নয়, তবে এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাসে মারাত্মক বিচ্যুতি বা ইটিং ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আপনি কি জানেন, এই ইটিং ডিজঅর্ডার কী এবং তা কেন হয়?

ইটিং ডিজঅর্ডার কী

ইটিং ডিজঅর্ডার হলো এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের আবেগ বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে খাবার গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এটি হলো, আশপাশের সবাই যা খাচ্ছে সে খাবারের দিকে নিজেকে নিয়ে যাওয়া কিংবা খাবার না খাওয়ার ট্রেন্ড ফলো করা। খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন কেবল শরীরের ক্ষতি করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কেবল শরীরের ক্ষতি করে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্ক্রিন টাইমের প্রতি অতিরিক্ত ঘণ্টা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ইটিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণ সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। ২০২১ সালের এক গবেষণায় ডক্টর জেসন নাগাতা দেখিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের প্রতি ঘণ্টার জন্য পরবর্তী এক বছরে ‘বিঞ্জ ইটিং ডিজঅর্ডার’-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৬২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া ২০২৩ সালের এক গবেষণা বলছে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানো কিশোর-কিশোরীরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয় বেশি, যা এই ব্যাধির অন্যতম কারণ।

সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে প্রভাব ফেলছে

অবাস্তব শারীরিক সৌন্দর্যের তুলনা: সোশ্যাল মিডিয়ায় কিশোর-কিশোরীরা প্রতিনিয়ত ফিল্টার করা এবং এডিট করা ছবি দেখে। এ ধরনের ছবি তারা বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে দেখে থাকে। এই ‘নিখুঁত’ শরীরের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে গিয়ে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে। আর এ প্রবণতাই তাদের খাদ্যাভ্যাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বডি ইমেজ ডিস স্যাটিসফ্যাকশন: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তারা নিজেদের শরীর নিয়ে বেশি অসন্তুষ্ট থাকে। এই অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি পেতে তারা অনেক সময় খাওয়া কমিয়ে দেয় বা অত্যন্ত কঠোর ডায়েট শুরু করে। ফিডে যদি কেবল একধরনের শারীরিক গঠন বা ডায়েট টিপস আসতে থাকে, তবে কিশোর-কিশোরীরা ভাবতে শুরু করে, এটিই ‘সঠিক’ শরীর এবং এটিই অর্জনের একমাত্র লক্ষ্য।

ক্ষতিকর ডায়েট কালচার ও ট্রেন্ড: সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন ওজন কমানোর চ্যালেঞ্জ বা অবৈজ্ঞানিক ডায়েট টিপস ভাইরাল হয়। কিশোর-কিশোরীরা সঠিক জ্ঞান ছাড়াই এগুলো অনুসরণ করতে গিয়ে ‘অ্যানোরেক্সিয়া’ বা ‘বুলিমিয়া’র মতো মারাত্মক ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হতে পারে।

ইটিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণ

ইটিং ডিজঅর্ডারের বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

খাবার নিয়ে অতিরিক্ত সচেতনতা: ক্যালরি গণনা করা বা নির্দিষ্ট কিছু খাবার নিয়ে আতঙ্কিত থাকা।

খাবার এড়িয়ে যাওয়া: পরিবারের সঙ্গে না খেয়ে একাকী খাওয়ার চেষ্টা করা বা বারবার খাবার এড়িয়ে যাওয়া।

শারীরিক পরিবর্তন: দ্রুত ওজন কমে যাওয়া বা খাওয়ার পরপরই বাথরুমে যাওয়ার প্রবণতা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি: সারাক্ষণ ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সারদের ফলো করা এবং নিজের ছবি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা।

সচেতনতাই প্রথম ধাপ

এই ইটিং ডিজঅর্ডার থেকে মুক্ত থাকার প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ ডিলিট করা একমাত্র সমাধান নয়। এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

  • খুব অল্প বয়সে সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে না দিয়ে তাদের মধ্যে সুস্থ জীবনবোধ গড়ে তোলার সময় দিন।
  • খোলামেলা আলোচনা করুন। সহানুভূতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের বোঝান, সোশ্যাল মিডিয়ার সবকিছু বাস্তব নয়।
  • সন্তানের নিজের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সাহায্য করুন।
  • যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপ বা কনটেন্ট মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, তবে সেই অ্যাপ ডিলিট করা বা সাময়িক বিরতি নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। তার মনোযোগ ভিন্ন কোনো দিকে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • কেবল বডি ইমেজ বা ফিটনেস নয়; বরং শখ, ভ্রমণ এবং সৃজনশীল কনটেন্ট দেখার জন্য তাদের উৎসাহিত করুন।

যদি সোশ্যাল মিডিয়া আপনার সন্তানের মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে কোনো রকম বিচার-বিবেচনা বা লজ্জা না দিয়ে তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, সিএনএন হেলথ, ইটিং রিকভারি সেন্টার

২। সহানুভূতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। তাকে বোঝান, সোশ্যাল মিডিয়ার সবকিছু বাস্তব নয়। ছবি: পেক্সেলস

সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়ফ্রেন্ডকে আড়ালে রাখছেন তরুণীরা, এই প্রবণতার মানে কী

সবচেয়ে প্রভাবশালী ৪ মিডিয়ার লাগাম এখন ৪ শীর্ষ ধনীর হাতে

বিনোদনের জন্য নিজের ডিপফেইক ভিডিও তৈরি করে দেবে ‘সোরা’

ফেসবুকে নতুন ফিচার ‘ফ্যান চ্যালেঞ্জ’, ব্যবহারে যে লাভ

শৈশবের নিজেকে কাছে পেলে কেমন হবে অনুভূতি

বিয়ে করেছেন ‘আংকেল রজার’, কনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবরিনা

তরুণদের মধ্যে নিজস্ব পাঠ্যক্রমে বই পড়ার প্রবণতা বাড়ছে

২০৫০ সাল নাগাদ ইনফ্লুয়েন্সারদের চেহারা কেমন হবে, ধারণা দিলেন গবেষকেরা

মার্ক জাকারবার্গ বনাম মার্ক জাকারবার্গ: নাম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে আইনি লড়াই

টিকটক মাতাচ্ছেন মার্কিন বাহিনীর তরুণী সেনারা, নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক