ক্ষণিকের ভালো লাগা নাকি মানসিক যন্ত্রণার ঝুঁকি
মানুষের সম্পর্কের রসায়ন চিরকালই রহস্যময়। প্রতিনিয়তই বদলায় ভালোবাসার ধরন ও ভাষা। মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের হাত ধরে সম্পর্কের অভিধানে যোগ হয়েছে হরেক রকম ‘শিপ’। ফ্রেন্ডশিপ ও রিলেশনশিপের মতো রোমাঞ্চকর শব্দ এখন বিগত দিনের গল্প। এগুলো ছাড়িয়ে গত কয়েক বছরে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ‘সিচুয়েশনশিপ’ নামের শব্দটি। সিচুয়েশন অর্থাৎ পরিস্থিতির চাপে পড়ে এ শব্দটি এখন প্রায় বাতিলের খাতায়। তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ‘ন্যানোশিপ’। নাম থেকেই বুঝতে পারছেন, এটি সিচুয়েশনশিপের মতো মাইক্রো নয়, ন্যানো। সম্ভবত ভালোবাসার আকাশে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটি রোমাঞ্চকর ঝলকের নাম ন্যানোশিপ। কিন্তু আধুনিক প্রেমের এ ধরনটি আদতেও নির্ভেজাল আনন্দ দেয়, নাকি আড়ালে রেখে যায় স্থায়ী কোনো ক্ষতি? আসুন দেখে নেওয়া যাক।
ন্যানোশিপ আসলে কী?
সহজ কথায়, ন্যানোশিপ হলো এমন একধরনের রোমান্টিক মিথস্ক্রিয়া, যার স্থায়িত্ব খুবই অল্প সময়ের জন্য। এটি কোনো কফিশপে দুই-চার ঘণ্টা সময় একসঙ্গে কাটানো হতে পারে বা কোনো ছুটিতে কাটানো কয়েকটি দিনও হতে পারে। ন্যানোশিপে দুজন মানুষ একজন অন্যজনের প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণ অনুভব করেন এবং একসঙ্গে দারুণ কিছু সময় কাটান। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ সম্পর্কে কোনো প্রতিশ্রুতি বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকে না। এটি তাৎক্ষণিক ভালো অনুভূতি দেয়; কিন্তু সময় পার হওয়ার পর তা নিয়ে আর কোনো মাথাব্যথা থাকে না।
কেন মানুষ এ সম্পর্কে জড়ায়?
মূলত এটি একটি অভিজ্ঞতা, যেখানে আবেগীয় গভীরতার চেয়ে বর্তমান মুহূর্ত উপভোগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডেটিং অ্যাপের এ যুগে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে শুধু আনন্দ ও রোমাঞ্চ খুঁজতে ন্যানোশিপ বেছে নেন। এটি সম্পর্কের কোনো স্থায়ী গন্তব্য নয়; বরং দুটি অপরিচিত মনের একটি সংক্ষিপ্ত ও আনন্দদায়ক বিরতি বলা চলে।
চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘সম্পর্কের এই ন্যানো সংস্করণটি মূলত মানসিক স্থিরতার অভাবে হয়। এটি একটি সম্পর্কের দায়িত্ব নেওয়া থেকে সাময়িক মুক্তি দিলেও প্রকৃত ভালোবাসার যে গভীরতা বা নির্ভরতা, তার বিকল্প কখনোই হয়ে উঠতে পারে না।’
সিচুয়েশনশিপের সঙ্গে এর পার্থক্য
অনেকেই ন্যানোশিপকে সিচুয়েশনশিপের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে এ দুটো সম্পর্কের মধ্য়ে পার্থক্য রয়েছে। সিচুয়েশনশিপ কয়েক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে পারে। কিন্তু ন্যানোশিপ কয়েক ঘণ্টা, খুব বেশি হলে কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে। সিচুয়েশনশিপে আবেগীয় ও শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি থাকে। অন্যদিকে, ন্যানোশিপ ক্ষণিকের ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সিচুয়েশনশিপ অস্পষ্ট হলেও ভবিষ্যতে স্থায়ী সম্পর্কে যাওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ন্যানোশিপের শুরুটাই হয় ‘এরপর আর কিছু নেই’—এই অলিখিত শর্তে।
ন্যানোশিপে ঝুঁকি কতটা?
আধুনিক ডেটিং অ্যাপের যুগে ন্যানোশিপ বেশ জনপ্রিয়। অনেকে তো টেরই পান না তিনি যা করছেন, তাকে ন্যানোশিপ বলে। অনেকেই ব্যক্তিগত কারণে বা নিজের সিদ্ধান্তেই জীবনে কোনো রকম সিরিয়াস সম্পর্কে জড়াতে চান না। তাঁদের জন্য ন্যানোশিপ একধরনের ডিটক্স হিসেবে কাজ করে। কোনো পিছুটান ছাড়া প্রায়ই নতুন কারও সঙ্গে সময় কাটানো তাঁদের একধরনের মানসিক প্রশান্তি দেয়। এটি মূলত বর্তমান মুহূর্তকে কোনো পিছুটান ছাড়া উপভোগ করার একটি আধুনিক কৌশল। তবে এর ক্ষতিকর দিকটি বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সানজিদা শাহরিয়া বলেন, ‘অনেক সময় মানসিক স্বচ্ছতা না থাকার কারণে এই ক্ষণিকের রোমান্স কারও জন্য দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের কারণ হতে পারে।’ তিনি আরও জানান, অনেকের জন্য ন্যানোশিপ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ফলে অনেক সময় এই ক্ষণিকের আনন্দ পরবর্তী জীবনের জন্য বিষাদময় ট্রমা হয়ে দাঁড়ায়।
সূত্র: দ্য ওয়েলনেস কর্নার ও অন্যান্য