হোম > জীবনধারা > ফিচার

আমেরিকায় হারিয়ে যাওয়া ‘গুপ্ত’ সুইডিশ উপনিবেশ

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা

নিউ সুইডিশরাই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম লগ কেবিন বা কাঠের কেবিনের প্রচলন করে। ছবি: এলিয়ট স্টেইন

আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনের মাহেন্দ্রক্ষণে পুরো বিশ্বের নজর ছিল পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া শহরের দিকে। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই, এই শহরেই আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান আমেরিকার এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক সূতিকাগারটি যে একসময় একটি ছোট্ট এবং প্রায় বিস্মৃত সুইডিশ উপনিবেশের অংশ ছিল, তা আজ অধিকাংশ আমেরিকান বা খোদ সুইডিশদেরও অজানা। বলা যায়, এটি আমেরিকায় হারিয়ে যাওয়া ‘গুপ্ত’ সুইডিশ উপনিবেশ।

১৬৩৮ থেকে ১৬৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই উপনিবেশের নাম ছিল ‘নিয়া ভেরিয়ে’ বা ‘নিউ সুইডেন’। আমেরিকার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে কম জনসংখ্যা-অধ্যুষিত এবং সবচেয়ে কম সময় স্থায়ী হওয়া ইউরোপীয় উপনিবেশ। তবে মাত্র ১৭ বছর স্থায়ী হলেও আমেরিকার সংস্কৃতি ও ইতিহাসে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। কলোনিটি বিস্তৃত ছিল বর্তমান নিউজার্সি, পেনসিলভানিয়া, ডেলাওয়ার এবং মেরিল্যান্ডের কিছু অংশজুড়ে।

নিউ সুইডেন সেন্টারের বোর্ড সদস্য ডেবোরা-জিন হফম্যান বলেন, ‘এটি মূলত একটি গোপন কলোনি হিসেবে শুরু হয়েছিল। ফরাসি বা স্প্যানিশদের মতো সুইডিশরা বুক ফুলিয়ে কলোনি স্থাপনের ঘোষণা দিয়ে আসেনি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ওলন্দাজ বা ডাচদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা করা।’

প্রতিশোধের আগুনে তৈরি ‘গুপ্ত উপনিবেশ’

১৬৩৭ সালের কথা। ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো যখন আমেরিকার আটলান্টিক উপকূল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছিল, তখন ওলন্দাজদের ‘নিউ নেদারল্যান্ড’ কলোনির সাবেক গভর্নর পিটার মিনুইট ডাচদের ওপর প্রতিশোধ নিতে সুইডিশ রাজপরিবারের দ্বারস্থ হন। ১৬৩২ সালে ডাচরা তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করায় তিনি প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলেন। তিনি সুইডেন কর্তৃপক্ষকে বোঝান, ইউরোপের একমাত্র বড় পরাশক্তি হিসেবে তাঁদের কোনো কলোনি নেই এবং তাঁরা পশম, তামাকসহ বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিন মাস্তুলবিশিষ্ট ‘কালমার নিকেল’ নামের জাহাজটি সুইডিশ ও ফিনিশ বসতি স্থাপনকারীদের প্রথম দলকে নিউ সুইডেনে নিয়ে এসেছিল। ছবি: সংগৃহীত

মানচিত্র হাতে মিনুইট দেখান, ডাচ ও ব্রিটিশদের সীমানার মাঝখানে একটি বিশাল এলাকা খালি পড়ে আছে। ১৬৩৭ সালের ডিসেম্বরে মিনুইটের নেতৃত্বে দুটি জাহাজ মাত্র ২৫ জন অভিযাত্রী নিয়ে সুইডেনের গোটেনবার্গ থেকে রওনা দেয়। ১৬৩৮ সালের মার্চ মাসে জাহাজ দুটি বর্তমান ডেলাওয়ারের উইলিংটন শহরে গোপনে নোঙর ফেলে।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও লেখক রাসেল শর্টো বলেন, ‘ডাচরা সঙ্গে সঙ্গেই এই খবর পেয়ে যায়। তারা ভেবেছিল, সুইডিশরা অবৈধভাবে তাদের জমিতে বসেছে। কিন্তু মিনুইট জানতেন, তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল ডাচদের নেই।’

মিনুইট পাঁচটি আদিবাসী আমেরিকান উপজাতির কাছ থেকে নদীতীরবর্তী ১০৮ কিলোমিটার জমি কিনে নেন এবং ১২ বছর বয়সী সুইডেনের রানি ক্রিস্টানার নামানুসারে ‘ফোর্ট ক্রিস্টিনা’ দুর্গ গড়ে তোলেন। এটিই ছিল ডেলাওয়ার উপত্যকায় প্রথম স্থায়ী ইউরোপীয় বসতি।

উপনিবেশ স্থাপনের মাত্র পাঁচ মাস পর, নতুন উপনিবেশের জন্য তামাকের খোঁজে ক্যারিবিয়ান সাগরে গিয়ে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে মারা যান মিনুইট। তাঁর সঙ্গে থাকা নিঃস্ব এবং ক্ষুধার্ত বাকি ২৫ অভিযাত্রীও হয়তো মারা যেত। কিন্তু স্থানীয় আদিবাসীরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

নিউ সুইডেন সেন্টারের বোর্ড সদস্য ডেবোরা-জিন হফম্যান বলেন, ‘সুইডিশরা ডাচ বা ইংরেজদের মতো ছিল না। তারা আদিবাসী উপজাতিদের বুঝত এবং সম্মান করত। এদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল ফরেস্ট ফিন (ফিনল্যান্ডের অধিবাসী, যা তখন সুইডেনের অংশ ছিল)। প্রকৃতির মাঝে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়, তা ফিনদের খুব ভালো জানা ছিল।’

বিদ্রোহ এবং ‘সুইডিশ নেশন’

১৬৪৩ সালে জোহান প্রিন্টজ নামের ৭ ফুট লম্বা এবং ১৮১ কেজি ওজনের এক বিশালদেহী মানুষ নিউ সুইডেনের গভর্নর হয়ে আসেন। স্থানীয় আদিবাসীরা তাঁর বিশাল পেটের কারণে তাঁকে ‘বিগ বেলি’ নামে ডাকত। প্রিন্টজ আমেরিকার বুকে সুইডেনের অবস্থান শক্ত করতে আরও দুটি দুর্গ গড়ে তোলেন এবং ফিলাডেলফিয়ার ঠিক দক্ষিণে টিনিকাম দ্বীপে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন।

আমেরিকার ইতিহাসে নিউ সুইডেন ছিল সবচেয়ে ছোট এবং সবচেয়ে কম সময় স্থায়ী হওয়া ইউরোপীয় উপনিবেশ। ছবি: সংগৃহীত

তবে এত আঞ্চলিক বিস্তার সত্ত্বেও নিউ সুইডেন কখনোই লাভজনক হতে পারেনি। কলোনিতে কখনোই ৪০০ জনের বেশি মানুষ ছিল না এবং ১৬৪৮ থেকে ১৬৫৪ সাল পর্যন্ত সুইডেন থেকে কোনো রসদবাহী জাহাজ আসেনি। বাধ্য হয়ে প্রিন্টজ অত্যন্ত কঠোর ও একনায়কতান্ত্রিক উপায়ে শাসন চালাতেন। কিন্তু ১৬৫৩ সালে কলোনির এক-চতুর্থাংশ পুরুষ অধিবাসী প্রিন্টজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে একটি গণ-আবেদন জমা দেয় এবং প্রিন্টজ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এটি ছিল আমেরিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রথম সফল রাজনৈতিক প্রতিবাদ।

১৬৫৫ সালের মধ্যে ডাচ গভর্নর পিটার স্টুইভেসেন্ট ৭টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে আক্রমণ করলে সংখ্যায় কম থাকায় সুইডিশরা গুলি না ছুড়েই আত্মসমর্পণ করে। তবে ডাচরা একে একটি স্বাধীন ‘সুইডিশ নেশন’ বা সুইডিশ জাতি হিসেবে থাকার অনুমতি দেয়। তারা নিজেদের সরকার গঠন এবং নিজেদের জমি ধরে রাখার অধিকার পায়।

আজকের দিনে নিউ সুইডেনের খোঁজ

আজকের দিনেও ডেলাওয়ার উপত্যকায় একটু খুঁজলেই এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের জীবন্ত স্মারকগুলো চোখে পড়ে। ফোর্ট ক্রিস্টিনা পার্কের দোভাষী হার্ব কোনার বলেন, ‘আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম তিনটি লগ কেবিন বা কাঠের ঘর ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হয়েছিল।’

পার্কের কাছেই নদীতে ভাসছে ১৭ শতকের তৈরি ১৪১ ফুট লম্বা সুইডিশ জাহাচের একটি নিখুঁত রেপ্লিকা ‘কালমার নিকেল’। এই তিন মাস্তুলবিশিষ্ট জাহাজটি চার-চারবার সফলভাবে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল।

ফোর্ট ক্রিস্টিনা পার্কের ভেতর রয়েছে একটি পুরোনো সুইডিশ চার্চ। ১৬৯৮ সালে নির্মিত এই চার্চ আমেরিকার প্রথম লুথারান চার্চ। এটি এখনো টিকে আছে এবং এখনো স্থানীয়রা এটিকে উপাসনালয় ‍হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পাশে রয়েছে একটি কবরস্থান। ১৬৩৮ সালের কবরস্থানটিতে প্রথম সুইডিশ সেটলাররা সমাহিত আছেন। আজও প্রতিবছরের ডিসেম্বরে তাঁদের সুইডিশ বংশধরেরা মোমবাতি জ্বালিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘সান্তা লুসিয়া’ ক্রিসমাস উৎসব উদ্‌যাপন করেন।

আজকের দিনে নিউ সুইডেনের আরেকটি বড় নিদর্শন হলো আমেরিকান সুইডিশ হিস্ট্রিক্যাল মিউজিয়াম। এর নির্বাহী পরিচালক ট্রেসি বেক একটি চমৎকার তথ্য দেন। তিনি জানান, আমেরিকার স্বাধীনতার পক্ষে পেনসিলভানিয়া রাজ্য থেকে যে চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক ভোটটি পড়েছিল, তা দিয়েছিলেন জন মর্টন নামের এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন এই নিউ সুইডিশদেরই বংশধর।

মিউজিয়ামের বাইরে প্রতিবছর ঐতিহ্যবাহী ‘মিড সমারফেস্ট’ উদ্‌যাপিত হয়। সেখানে শত শত মানুষ ফুলের মুকুট ও ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে জড়ো হন। সুইডিশ ঐতিহ্যবাহী খাবার, গান আর নাচের আমেজে মেপোলের চারপাশে সবাই গোল হয়ে হাত ধরে নাচেন। সেখানে উপস্থিত এক সুইডিশ নারী বলেন, ‘এটিই আমাদের কাছে ফোর্থ অব জুলাইয়ের মতো।’

বিবিসির সাংবাদিক এলিয়ট স্টেইনের পেনসিলভানিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে

আর্লিং হালান্ড: নরওয়েজিয়ান রোবটের ‘আদিম’ খাদ্যাভ্যাস আর পাগলামির গল্প

সাম্বার তালে ব্রাজিল দুলবে কি আজ

মরোক্কান হাম্মাম স্পা কী? ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে বাড়িতে যেভাবে এই স্পা করা হয়

৯১ বছর বয়সে মাকায়ার ১৮তম বিশ্বকাপ মিশন

যে দেশে এখনো চলে লুনার ক্লক

মাকড়সার জাল থেকে বিশ্বমঞ্চে ঘানার কাপড় ‘কেন্তে’ ও ‘ফুগু’

জাপানিদের পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে

নব্বই মিনিটের বাইরে ফুটবল তারকাদের জীবনের সেরা ‘হোম টিম’

রাতে খেলা দেখে সকালে অফিসে ঝিমুনি, জানুন চাঙা থাকার উপায়

তুর্কি কফি-কাপের তলানিতে সত্যিই কি লেখা থাকে ভবিষ্যৎ