হোম > জীবনধারা > ফিচার

পৃথিবীর বিষণ্নতম দেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশের অবস্থান কত

ফিচার ডেস্ক 

বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন বা ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী দেশগুলোর তালিকায় প্রথমে উঠে এসেছে আফগানিস্তানের নাম। ছবি: সংগৃহীত

আমরা যখন পৃথিবীর কোনো দেশের অগ্রগতি বা শক্তির কথা ভাবি, আমাদের মাথায় সবার আগে আসে সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপির হিসাব। কিন্তু একটি দেশের মানুষ ভেতরে-ভেতরে কতটা ভালো আছে, তাদের দৈনন্দিন জীবন কতটা স্বস্তির, তা পরিমাপ করার অন্যতম বৈশ্বিক মাপকাঠি হলো বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন বা ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট। এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী দেশগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে প্রথমে উঠে এসেছে আফগানিস্তানের নামে। ২৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম। তালিকায় ১৪৭টি দেশের নাম উঠে এসেছে।

যেভাবে এই তালিকা করা হয়

বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনটি মূলত গ্যালাপ ওয়ার্ল্ড পোলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্কেলের সাহায্যে নিজের জীবন নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট, তা মূল্যায়ন করে। এই স্কেলকে বলা হয় ক্যান্ট্রিল ল্যাডার। সেখানে শূন্য মানে সবচেয়ে খারাপ এবং ১০ মানে জীবনের সবচেয়ে সেরা পরিস্থিতি। প্রতিবেদনে কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে বিগত তিন বছরের অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের গড় মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত র‍্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে কোনো দেশের সাময়িক উত্থান-পতন এড়িয়ে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার একটি স্থিতিশীল ও বাস্তবসম্মত চিত্র পাওয়া যায়। মানুষের এই জীবন মূল্যায়নের পেছনে মূলত কয়েকটি বিষয় কাজ করে। যেমন অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা সংঘাত, মানবিক সংকট, স্বাধীনতার অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যেসব দেশে এই সমস্যাগুলো প্রকট, সেসব দেশের মানুষ নিজেদের কম স্কোর দিয়েছেন। সেগুলোই তালিকার নিচের দিকে অর্থাৎ দুঃখী দেশের তালিকায় জায়গা পেয়েছে।

কোন দেশের স্কোর কেমন

বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন ২০২৬-এর এই সূচকে প্রতিটি দেশের স্কোর মূলত শূন্য থেকে ১০-এর স্কেলে নাগরিকদের জীবন সন্তুষ্টির প্রতিফলন। এই তালিকায় যথারীতি শীর্ষ স্থানটি ধরে রেখেছে ইউরোপের নর্ডিক দেশ ফিনল্যান্ড। দেশটির সুখের স্কোর সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৮। অন্যদিকে মানচিত্রের ঠিক উল্টো পিঠে মাত্র ১ দশমিক ৪ স্কোর নিয়ে তালিকার সবচেয়ে নিচে অর্থাৎ পৃথিবীর দুঃখীতম দেশের অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ও স্কোর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সূচকে ১০-এর মধ্যে ৪ দশমিক ৩ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ২৯টি দুঃখী দেশের তালিকায় ২১ নম্বরে অবস্থান করছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার ওপর তৈরি হওয়া নানামুখী চাপের কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন সন্তুষ্টির এই স্কোর অনেকটাই নিচের দিকে নেমে এসেছে।

কোন মহাদেশের নাম বেশি এবং কেন

দুঃখী দেশের তালিকাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে বেশি নাম এসেছে আফ্রিকা মহাদেশের। উগান্ডা, সিয়েরা লিওন, মালাউই, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, কঙ্গো, মিসর, তানজানিয়া, কমোরোস, এসওয়াতিনি, ইথিওপিয়া, জাম্বিয়া, মাদাগাস্কার, টোগো, লাইবেরিয়া, গাম্বিয়া, লেসোথো, বেনিন, বুর্কিনা ফাসো এবং মৌরিতানিয়ার মতো আফ্রিকার প্রায় ২০টি দেশ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। এরপরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাম এসেছে এশিয়া মহাদেশের। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য। এশিয়া থেকে আফগানিস্তান, ইয়েমেন, লেবানন, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও জর্ডানের মতো দেশগুলো এই তালিকায় রয়েছে। এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে, একটি দেশের সুউচ্চ ভবন কিংবা জিডিপির গ্রাফ কখনোই মানুষের প্রকৃত হাসির নিশ্চয়তা দিতে পারে না। যদি না সেখানে নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বস্তির অধিকার নিশ্চিত করা যায়।

কেন কিছু নির্দিষ্ট মহাদেশেই জমছে এই দুঃখের পাহাড়

এই দুঃখী দেশের তালিকার ভৌগোলিক বিন্যাসের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট এবং দুঃখজনক সত্য সামনে আসে। এখান থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীর মানচিত্রে সুখের বণ্টন মোটেও সমান নয়। এই ২৯টি দেশের মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ২০টি দেশই সাব-সাহারান এবং উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের। এর ঠিক পরেই অবস্থান করছে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রধান।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই দুটি মহাদেশেরই এতগুলো দেশের নাম বারবার ফিরে এসেছে? তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে তিনটি ভিন্ন আঙ্গিক বা গভীর সামাজিক ক্ষত দৃশ্যমান হয়। সেগুলো হলো—

মিসর, লেবানন, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে সাম্প্রতিক বছরের তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষের প্রতিদিনের স্বস্তি শেষ করে দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

অধিকার হরণ ও নাগরিক স্বাধীনতার ঘাটতি: তালিকার সবচেয়ে নিচে থাকা আফগানিস্তানের পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়, কেবল অর্থনৈতিক অভাবই মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুঃখী করে না। সেখানে নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর যে তীব্র বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা পুরো একটি জনগোষ্ঠীর মন থেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে সব ধরনের আশা মুছে দিয়েছে। মিয়ানমার ও কঙ্গোর মতো দেশে সামরিক সংঘাত এবং গৃহযুদ্ধ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক নিরাপত্তাকেই কেড়ে নিয়েছে।

কাঠামোগত অর্থনৈতিক ধস ও মূল্যস্ফীতি: এশিয়া ও আফ্রিকার এই দেশগুলোর একটি বড় অংশই তীব্র ঋণসংকট এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মিসর, লেবানন, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া বিশাল ব্যবধান এবং সাম্প্রতিক বছরের তীব্র অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষের প্রতিদিনের স্বস্তি শেষ করে দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের পকেটে তার সুফল না পৌঁছানোয় দীর্ঘমেয়াদি এক ক্লান্তি ভর করেছে এসব সমাজে।

জলবায়ু ও ভূরাজনীতির দ্বিমুখী মার: মাদাগাস্কার বা বুরকিনা ফাসোর মতো আফ্রিকার দেশগুলো উন্নত বিশ্বের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার। তীব্র খরা, অনাবৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ওপর আবার যোগ হয়েছে প্রতিবেশী অঞ্চলের যুদ্ধের প্রভাব। জর্ডান ও উগান্ডার মতো দেশগুলো নিজেরা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে থেকেও বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর যে চাপ পড়ছে, তা পরোক্ষভাবে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত করছে।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট

জন্মশতবার্ষিকীতে প্রকাশিত হলো মেরিলিন মনরোর দুর্লভ ছবির বই, কী রয়েছে তাতে

সম্পর্কের নতুন জটিলতা ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’

ক্যাফেইন গ্রহণের পরিমাণ কমানোর সহজ উপায়

‘নিজের মতো সময়যাপন’ বা ‘মি টাইম’ প্রয়োজন যে কারণে

দীর্ঘায়ু চাইলে দক্ষিণ কোরীয়দের যেসব অভ্যাস ও খাবারে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

অল্প নয়, বেশি সময় ধরে হাঁটুন

বদলে যাওয়া সময়ে পরিবারের সঙ্গে বন্ধন অটুট রাখুন

কেন সবাই খুঁজছেন ‘কালিনারি ক্লাস ওয়ার্স’ শেফদের?

আপনার অস্থিরতার গভীরে লুকিয়ে থাকা আসল আবেগটি চিনুন

আপনি কি জীবনের ডার্ক নাইট কাটাচ্ছেন, জেনে নিন লক্ষণ ও উত্তরণের পথ