হোম > জীবনধারা > ফিচার

মারাদোনিয়ান চার্চ: যেখানে দেবতা মারাদোনা, ধর্ম ফুটবল

রজত কান্তি রায়, ঢাকা  

মারাদোনিয়ান চার্চ বা ইগলেসিয়া মারাদোনিয়ানা একটি সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী আন্দোলন, যেখানে কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনা শুধু এক মহান খেলোয়াড়ই নন, বরং হয়ে উঠেছেন অধ্যাত্মবাদের প্রতীক! প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

প্রিয় খেলোয়াড়কে দেবতার আসনে বসানোর উন্মাদনা শুধু ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নেই, আছে ফুটবল-সমর্থকদের মধ্যেও। আর সেটা আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায়। হবেই তো! আর্জেন্টিনা মানেই ফুটবল। সেই দেশে খেলাটি নিয়ে এমন মাতামাতি না থাকলে কোন দেশে থাকবে?

সন্ত মারাদোনা। ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল ঘিরে মানুষের আবেগ কতটা গভীর হতে পারে, এর উত্তর জানতে হলে যেতে হবে আর্জেন্টিনার এক অভিনব প্রতিষ্ঠানে। নাম মারাদোনিয়ান চার্চ বা ইগলেসিয়া মারাদোনিয়ানা, যেখানে দেবতা মারাদোনা, ধর্ম ফুটবল। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক ও প্রতীকী আন্দোলন, যেখানে কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনা শুধু এক মহান খেলোয়াড়ই নন, বরং হয়ে উঠেছেন অধ্যাত্মবাদের প্রতীক!

হার্নান আমেজ, হেক্টর ক্যাপোমার, আলেজান্দ্রো ভেরন এবং ফেদেরিকো ক্যানেপা নামে দিয়েগো মারাদোনার চার ‘ডাইহার্ট ফ্যান’ বসবাস করেন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। মারাদোনা আর ফুটবলের ভক্ত হিসেবে তাঁদের যুক্তি ছিল খুব সহজ, ‘ফুটবল যদি ধর্ম হয়, তবে তারও একজন দেবতা থাকা উচিত; আর সেই দেবতা হলেন দিয়েগো মারাদোনা।’ ব্যস। সহজ এই যুক্তির ওপর ভর করে ১৯৯৮ সালের ৩০ অক্টোবর, মারাদোনার ৩৮তম জন্মদিনে তাঁরা মারাদোনিয়ান চার্চ তৈরির ঘোষণা দিলেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা মারাদোনার জন্মদিনকে ধরে বছর গণনা শুরু করলেন অর্থাৎ তৈরি করলেন এক নতুন ক্যালেন্ডার। একে বলা হয় d.D. বা después de Diego। স্প্যানিশ শব্দ ডেসপেস মানে পর। অর্থাৎ মারাদোনার পর। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বিসি ও এডি যে অর্থে ব্যবহার করা হয়, ডি.ডি ও সেই অর্থে ব্যবহার করা হয়।

এই ক্যালেন্ডার অনুসারে, মারাদোনার জন্মদিন ৩০ অক্টোবর উদ্‌যাপন করা হয় ‘মারাদোনিয়ান ক্রিসমাস’। আর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের স্মৃতি স্মরণ করার জন্য ২২ জুন পালন করা হয় ‘মারাদোনা ইস্টার’। শুধু কি তাই? শুরু হলো নতুন সদস্যদের দীক্ষা দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টধর্মের প্রধান ও প্রথম দীক্ষা স্নানের অনুকরণে প্রতীকী বাপ্তিস্ম বা ব্যাপ্টিজম অনুষ্ঠান! এখানেই শেষ নয়।

মারাদোনিয়ান চার্চের রীতি পালন করা হচ্ছে। ছবি: ওয়ানডিও ডট কম

মারাদোনিয়ান চার্চের অনুসারীরা ‘মারাদোনা’ বোঝাতে D10S শব্দটির প্রচলন করলেন। স্প্যানিশ ভাষায় Dios অর্থ ঈশ্বর, আর ১০ মানে তো জানেন, মারাদোনার বিখ্যাত জার্সি নম্বর। ফলে D10S শব্দটি একদিকে ঈশ্বর, অন্যদিকে মারাদোনার প্রতীক হয়ে উঠল বিশ্বজুড়ে ৬০টি দেশ এবং ৬০০টির বেশি শহরে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার অনুসারীর কাছে। মারাদোনার জার্সি নম্বরের সংখ্যা নিয়ে তৈরি হলো ১০টি নিয়ম। সেটিকে চার্চের অনুসারীরা বলে থাকেন ‘দশ আদেশ’।

মারাদোনিয়ান চার্চের ১০টি নিয়ম বা দ্য টেন কমান্ডমেন্টস

  • বল কখনো নোংরা করা যাবে না (The ball is never soiled): মারাদোনার একটি বিখ্যাত উক্তি থেকে এটি নেওয়া হয়েছে।
  • সবকিছুর ঊর্ধ্বে ফুটবল ভালোবাসতে হবে (Love football above all else): জীবন ও জগতের যেকোনো কিছুর চেয়ে ফুটবল খেলাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
  • দিয়েগো এবং ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা প্রকাশ করতে হবে (Declare unconditional love for Diego and the beauty of football): মারাদোনার জাদুকরি ফুটবলপ্রতিভার প্রতি আজীবন অনুগত থাকতে হবে।
  • আর্জেন্টিনার জার্সিকে রক্ষা ও সম্মান করতে হবে (Defend the Argentine shirt): জাতীয় দলের জার্সির মর্যাদা যেকোনো মূল্যে বজায় রাখতে হবে।
  • মহাবিশ্বজুড়ে দিয়েগোর অলৌকিক কীর্তির বাণী প্রচার করতে হবে (Spread the news of Diego's miracles throughout the universe): মাঠে মারাদোনার অবিশ্বাস্য ফুটবলশৈলীর গল্প সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
  • মারাদোনার স্মৃতিবিজড়িত মাঠ এবং তাঁর জার্সিগুলোকে সম্মান জানাতে হবে (Honour the temples where he played and his sacred shirts): মারাদোনার স্মৃতিবিজড়িত স্টেডিয়াম ও কিটগুলোকে পবিত্র মনে করতে হবে।
  • দিয়েগোকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্লাবের একক সম্পত্তি হিসেবে দাবি করা যাবে না (Don't proclaim Diego as a member of any single team): মারাদোনা শুধু বোকা জুনিয়র্স বা নাপোলির নন, তিনি পুরো ফুটবল বিশ্বের।
  • মারাদোনিয়ান চার্চের আদর্শ প্রচার ও প্রসার করতে হবে (Preach and spread the principles of the Iglesia Maradoniana): এই বিশেষ ফুটবল-ধর্মের দর্শন চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে।
  • নিজের নামের মধ্যবর্তী অংশ হিসেবে ‘দিয়েগো’ ব্যবহার করতে হবে (Make ‘Diego’ your middle name): নিজের পরিচয়ে মারাদোনার নাম জুড়ে নিতে হবে।
  • নিজের প্রথম পুত্রসন্তানের নাম রাখতে হবে ‘দিয়েগো’: (Name your first son Diego): পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে মারাদোনার নাম বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

শুধু যে কয়েকজন ফুটবল অন্তঃপ্রাণ মানুষ মারাদোনিয়ান চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিল, গল্পটি এখানেই শেষ নয়। শুনলে অবাক হবেন, রোমান রিকেলমে, কার্লোস তেভেজ এবং লিওনেল মেসিও আছেন এই চার্চের সদস্য হিসেবে! আছেন মারাদোনার প্রতিভা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যিনি, সেই ফ্রান্সিসকো কর্নেখো, ডন ফ্রান্সিস নামে যাঁর সমধিক পরিচিতি। না না, তালিকা শেষ হয়নি। মাইকেল ওয়েন! হ্যাঁ, মাইকেল ওয়েনও আছেন এই চার্চের অনুসারী হিসেবে।

মারাদোনিয়ান চার্চের গ্রাফিতি। ছবি: উইকিপিডিয়া

মজাটা হলো অন্য জায়গায়। যে ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবলের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার চিরশত্রু ভাবা হয়, সেই ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় রোনালদিনহো মারাদোনিয়ান চার্চের ঈশ্বরে বিশ্বাস এনেছেন বেশ আগে! শুধু তা-ই নয়, তিনি এই চার্চের কাছ থেকে জার্সি সংগ্রহ করেছেন এবং সেটি পরে ছবি তুলেও পাঠিয়েছেন!

চলুন, এবার এই চার্চের ‘দিয়েগো আমাদের’ নামের যে প্রার্থনা আছে, সেটি পড়ে নিই।

হে মাঠের দিয়েগো,

তোমার বাঁ পা পবিত্র হোক।

তোমার জাদু আমাদের মাঝে নেমে আসুক।

যেমন স্বর্গে তোমার গোল স্মরণ করা হয়,

তেমনি পৃথিবীতেও স্মরণ করা হোক।

প্রতিদিন আমাদের সেই জাদু দাও।

ইংরেজদের ক্ষমা করো,

যেমন আমরা নেপলসের মাফিয়াদের ক্ষমা করি।

আমাদের অফসাইডে পড়তে দিয়ো না,

এবং হাভেলাঞ্জ ও পেলের প্রভাব থেকে মুক্তি দাও।

দিয়েগো মারাদোনা অনন্ত প্রশান্তিময় জীবনে সুখে থাকুন। আমরা তাঁর উত্তরসূরিদের ছন্দময় খেলা উপভোগ করি।

সূত্র: ম্যান অব মেনি ডট কম, এনএসএস-স্পোর্টস ডট কম

বয়স ৫০-এর পর ফিট থাকতে চাই মনের জোর

ভুট্টায় ভাগ্যবদল! বিক্রেতা থেকে গ্লোবাল ক্রাশ তেমেল

প্রযুক্তির যেসব জাদু থাকছে এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে

ভ্যাপসা গরমে ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ রাখতে করণীয়

ভ্রমণ এখন এক প্রতিযোগিতামূলক খেলা

হরর সিনেমা ভালোবাসে জেন-জি, কিন্তু কেন

কমিকস থেকে বাস্তবে জাপানে মায়েদের জন্য ‘নাইটটাইম ক্রাইং ক্যাফে’

রাত ৯টার পর যেসব কাজ করবেন না

জন্মশতবার্ষিকীতে প্রকাশিত হলো মেরিলিন মনরোর দুর্লভ ছবির বই, কী রয়েছে তাতে

পৃথিবীর বিষণ্নতম দেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশের অবস্থান কত