গভীর রাতে যখন চারপাশ নিঝুম। হঠাৎ আপনার পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটি যদি বিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘ধর ধর! চোরটা পালাচ্ছে!’ ভাবুন তো, চমকে উঠবেন, নাকি ফিক করে হেসে ফেলবেন? ঘুমের মধ্যে মাঝরাতের বাক্যালাপ বা ঘুমের ঘোরে কথা বলা অনেকেরই স্বভাব।
এই অভ্যাস হাজার বছর ধরে মানুষকে যেমন রহস্যের সাগরে ভাসিয়েছে, তেমনই জুগিয়েছে বিনোদনের রসদও। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ঘুমের ঘোরে কথা বলাকে বলা হয় ‘সোমনিলোকুই’। এটি একধরনের ‘প্যারাসোমনিয়া’ বা ঘুমজনিত স্বাভাবিক-বহির্ভূত আচরণ। মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রায় ৬৬ শতাংশ ব্যক্তিই ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি কমে আসে। মাত্র ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়।
মানুষ কেন ঘুমের ঘোরে কথা বলে
অনেকে মনে করেন, মানুষ শুধু স্বপ্নের ঘোরেই কথা বলে, কিন্তু বিজ্ঞান জানাচ্ছে অন্য কথা। ঘুমের যেকোনো পর্যায়েই মানুষ কথা বলতে পারে। ঘুমের নন-আরইএম পর্যায়ে মস্তিষ্কে আংশিক জাগ্রত অবস্থা বা ‘পার্শিয়াল অ্যাওয়েকেনিং’ তৈরি হয়। এই সময়ে প্রধানত বিড়বিড় করা, অস্পষ্ট আওয়াজ বা ছোট ছোট বাক্য বের হয়। আরইএম পর্যায়ে মানুষ সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাণবন্ত স্বপ্ন দেখে। সাময়িকভাবে আমাদের মাংসপেশি অবশ্য থাকার কথা। মস্তিষ্কের মোটর সংকেত বাধা না পেলে মানুষ স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে ছড়া, সংলাপ বা দীর্ঘ বক্তব্যও বলে ফেলে। এ ছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, জ্বর, অ্যালকোহল বা মাদক গ্রহণ এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও মানুষ ঘুমের ঘোরে কথা বলতে পারে।
ঘুমের কথা কি সত্যি
পাশের মানুষটির ঘুমের ঘোরে বলা কথা শুনে গোপন রহস্য জানার আশা থাকলে হতাশ হতে হবে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের মতে, ঘুমের ঘোরে কথা বাস্তব জীবনের সত্য প্রকাশ করে না। এর বেশির ভাগই অবান্তর, অবাস্তব এবং কাল্পনিক। যদিও ভাষাটি ব্যাকরণগতভাবে সঠিক থাকে, তবে এর ভেতরের অর্থ প্রায়শই থাকে অর্থহীন। প্যারিসের পিটি-সালপেত্রিয়ের হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ সবচেয়ে বেশি যে শব্দ ব্যবহার করে, তা হলো ‘না’। এ ছাড়া গালাগালি বা ক্ষোভ প্রকাশের প্রবণতাও এতে বেশি দেখা যায়, যা মূলত স্বপ্নের ভেতরের নেতিবাচক আবেগের প্রতিফলন। আইনগত দিক থেকেও ঘুমের ঘোরে বলা কোনো বক্তব্যকে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
সাধারণত ঘুমের ঘোরে কথা বলা সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নয়। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়
ঘুমের ঘোরে কথা বলা বন্ধ করার কোনো নিশ্চিত ওষুধ নেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে এটি কমানো সম্ভব।
ঘুমের ঘোরে কথা বলা আমাদের মানব শরীরের এক আশ্চর্যজনক ও স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। তাই মাঝরাতে পাশের মানুষটি হঠাৎ কোনো অদ্ভুত কথা বলে উঠলে ভয় না পেয়ে একে নিখাদ বিনোদন হিসেবে নেওয়াই শ্রেয়।
সূত্র: ওয়েবমেড, ফোর্বস