চুল নিয়ে কত কবিতা, কত গান, কত উপাখ্যান! সুন্দর, ঘন ও লম্বা চুল সবাই চায়। কিন্তু অনেকেই অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের পর চুল আর বড় হতে চায় না। আবার অনেকের দুশ্চিন্তা, মাথার কোনো কোনো অংশে চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে। চুল কেন বাড়ে না, কখন এর বৃদ্ধি থমকে যায় এবং কীভাবে এর যত্ন নেওয়া উচিত, তা জেনেই আসলে সঠিক যত্ন নেওয়া সম্ভব। কোনো অলৌকিক বিজ্ঞাপন বা প্রোডাক্ট মানুষের চুলের প্রাকৃতিক বৃদ্ধির গতিকে রাতারাতি বাড়িয়ে দিতে পারে না। অতিরিক্ত হিট, ক্ষতিকর ডাই বা রং ও রাসায়নিকের ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাই চুলের দৈর্ঘ্য বজায় রাখার একমাত্র চাবিকাঠি। মাথার ত্বকে চুলকানি থাকলে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুলের বৃদ্ধি কোনো অবিরাম প্রক্রিয়া নয়। প্রতিটি চুল একটি নির্দিষ্ট চক্র বা সাইকেলের মধ্য দিয়ে যায়। এই চক্রের চারটি ধাপ রয়েছে।
অ্যানাজেন ফেজ: এটি চুলের সক্রিয় বৃদ্ধির ধাপ। সাধারণত ২ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত এই ধাপ স্থায়ী হয়। আমাদের মাথার প্রায় ৯০ শতাংশ চুল যেকোনো মুহূর্তে এই ধাপে থাকে। যেমন গর্ভাবস্থায় হরমোনের কারণে চুল বেশি সময় এই ধাপে থাকে। তাই তখন চুল বেশি উজ্জ্বল ও ঘন দেখায়।
ক্যাটাজেন ফেজ: এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন ধাপ। এই ধাপ ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ স্থায়ী হয়। এই সময়ে চুলের বৃদ্ধি থেমে যায়, তবে চুল ঝরে পড়ে না।
টেলোজেন ফেজ: এটি চুলের বিশ্রামের ধাপ। ২ থেকে ৩ মাস স্থায়ী এই ধাপে চুল আলগা হয়ে যায় এবং চিরুনি বা শ্যাম্পু করার সময় ঝরে পড়ে।
এক্সোজেন ফেজ: এই ধাপে পুরোনো চুল পুরোপুরি ঝরে যায় এবং একই ফলিকল বা চুলের গোড়া থেকে নতুন চুল গজানো শুরু হয়। প্রতিদিন ৫০-১০০টি চুল ঝরে পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।
প্রতিটি মানুষের চুল কতটা লম্বা হতে পারবে, তার একটি প্রাকৃতিক সীমা বা সিলিং রয়েছে। যদি গড়ে প্রতি মাসে চুল শূন্য দশমিক ৪ ইঞ্চি বা বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৯ ইঞ্চি বাড়ে এবং সেটি যদি কয়েক বছর অ্যানাজেন ধাপে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের চুল কাটছাঁট না করলেও সাধারণত ৩ দশমিক ৩ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থমকে যায়। তবে ব্যতিক্রমও ঘটে। যেমন ২০০৪ সালে গিনেস রেকডর্স অনুযায়ী, চীনের এক নারীর চুল ১৮ দশমিক ৪৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হওয়ার রেকর্ড করা হয়েছিল। এই দীর্ঘ চুল মূলত জিনগত ভাগ্য, হরমোনের ভারসাম্য এবং চুলের বাড়তি যত্নের ওপর নির্ভর করে।
বংশগতি ও বয়স: নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই চুল পাতলা হওয়া বা টাক পড়ার পেছনে জিনগত কারণ বড় ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের পর হরমোনের পরিবর্তনে এবং পুরুষদের ৫০ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে চুল উল্লেখযোগ্যভাবে পাতলা হয়ে যায়। বয়স বাড়লে ফলিকলগুলো সংকুচিত হয়ে ছোট ও দুর্বল চুল উৎপন্ন করে।
হরমোন ও থাইরয়েড: থাইরয়েডের সমস্যা হলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা চুল পড়ার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া অ্যান্ড্রোজেন (টেস্টোস্টেরন সংশ্লিষ্ট পুরুষ হরমোন) হরমোনের প্রভাবে চুলের বৃদ্ধির ধাপ ছোট হয়ে যায়।
মানসিক ও শারীরিক চাপ: তীব্র মানসিক চাপ, বড় কোনো অস্ত্রোপচার, সন্তান জন্মদান কিংবা প্রিয়জন হারানোর মতো বড় ধাক্কায় শরীর কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ করে। এটি চুলের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয় এবং একসঙ্গে অনেক চুলকে জোরপূর্বক বিশ্রামের ধাপে পাঠিয়ে দেয়। এই ঘটনার কয়েক মাস পর হঠাৎ প্রচুর চুল ঝরতে শুরু করে।
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ও অন্যান্য রোগ: শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ত্রুটির কারণে অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা বা মাথার নির্দিষ্ট অংশে গোল হয়ে চুল পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া লিভার বা কিডনি বিকল হওয়া, ক্যানসার, রিউমাটোলজিক্যাল সমস্যা এবং কেমোথেরাপির মতো ওষুধের কারণেও চুল পড়া বা বৃদ্ধি বন্ধ হতে পারে।
চুল কাটার পর মনে হতে পারে, চুল খুব ধীর গতিতে বাড়ছে। তবে নিয়মিত ট্রিম করা ভালো; কারণ, এটি চুলের ফাটা অংশ দূর করে চুল ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।
প্রতিটি চুলের ফলিকলের রক্ত সঞ্চালনপ্রক্রিয়া আলাদা। মাথার যে পাশে রক্ত সঞ্চালন ভালো, সেদিকের চুল দ্রুত বাড়ে। আবার সব সময় এক কাতে ঘুমানোর অভ্যাসের কারণেও এক পাশের চুলে ঘর্ষণ ও চাপ লেগে বৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।
চুলে বারবার কেমিক্যাল বা টান পড়ার কারণে যদি ফলিকল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা স্কারিং (দাগ) তৈরি হয়, তবে সেখানে আর কখনোই চুল গজায় না।
হারিয়ে যাওয়া বা পুরোপুরি টাক হয়ে যাওয়া চুল ঘরোয়া উপায়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন। তবে চুলের দৈর্ঘ্য রক্ষা করতে এবং ফলিকল সতেজ রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়—
ঘরোয়া যত্ন: মাথার ত্বকে ম্যাসাজ করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং চুল ঘন হয়। অ্যালোভেরা চুলের ভেঙে যাওয়া রোধ করে কন্ডিশনারের কাজ করে। এ ছাড়া রোজমেরি অয়েল নতুন চুল গজাতে এবং জেরানিয়াম অয়েল রক্ত চলাচল বাড়াতে সাহায্য করে।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: ডায়েটে ভিটামিন ডি, বি, এ, বায়োটিন, জিংক, আয়রন, কপার, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার রাখলে চুল ভেতর থেকে পুষ্টি পায়। ফলে চুলের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য দুটিই ভালো থাকে।
সূত্র: হেলথ লাইন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ