সকালের নাস্তায় পাউরুটি মুখে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে মনে কি ভয় কাজ করে? ভাবেন যে, ‘উফ, আজ তো কার্বোহাইড্রেট খেয়ে ফেললাম, ওজন বুঝি আবার বেড়ে গেল!’ অথবা ডায়েট করার চক্করে নিজের সব প্রিয় খাবার জীবন থেকে চিরতরে বিদায় করে দিয়েছেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন। কারণ, আপনি একা নন! আমরা সবাই প্রতিনিয়ত এমন হাজারো ডায়েট মিথ বা ভুল ধারণার চোরাবালিতে আটকে আছি, যেখানে ‘সুস্থ থাকা’ মানেই এক আজব যুদ্ধ জয় করা। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে চোখ রাখলেই মনে হয়, সুস্বাস্থ্য মানেই বুঝি সিদ্ধ ডিমের সাদা অংশ আর ঘাস-পাতা চিবিয়ে বেঁচে থাকা। চলুন, আজ এই ডায়েট মিথগুলোর পর্দাফাঁস করা যাক, যাতে আর যাই হোক, অন্তত খাবার টেবিলে বসে অপরাধবোধে ভুগতে না হয়।
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা মানেই বুঝি শরীরের শত্রু। ভাত, রুটি বা পাস্তা দেখলেই অনেকে আতঙ্কে দূরে সরে যান। কিন্তু সত্য হলো, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য কার্ব একান্ত প্রয়োজন। আসল কথা হলো আপনি কোন ধরনের কার্ব খাচ্ছেন। কুকিজ বা ক্যান্ডির মতো রিফাইন্ড বা সিম্পল কার্ব এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হলেও, লাল চালের ভাত, হোল-হুইট ব্রেড বা ওটসের মতো জটিল বা কমপ্লেক্স কার্ব ফাইবার ও পুষ্টিতে ভরপুর। এগুলো আপনাকে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও দারুণ কার্যকর।
আরেকটি প্রচলিত মিথ হলো, সুস্থ থাকতে হলে ডায়েট থেকে সব ধরনের চর্বি বা ফ্যাট চিরতরে দূর করতে হবে। অথচ ফ্যাট আমাদের শরীরের একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। এভোকাডো, বাদাম বা জলপাই তেলের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হরমোন ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। সমস্যা হলো অতিরিক্ত বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট। তাই ফ্যাট পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমিত পরিমাণে ভালো ফ্যাট বেছে নেওয়াই আসল বুদ্ধিমানের কাজ।
সুপারমার্কেটের তাকে ‘লো-ফ্যাট’ বা ‘ফ্যাট-ফ্রি’ লেখা চকচকে প্যাকেজ দেখে অনেক সময় আমরা ভেবে বসি—এগুলো যত খুশি খাওয়া যায়, ওজন বাড়ার জো নেই! কিন্তু সাবধান, এই ‘অলৌকিক’ খাবারগুলোতে ফ্যাট কমানোর চক্করে প্রচুর পরিমাণে চিনি, স্টার্চ বা লবণ মেশানো হয়। ফলে এগুলোতে ক্যালোরির পরিমাণ সাধারণ খাবারের চেয়ে অনেক সময় বেশিই থাকে। তাই লেবেল না দেখে সরাসরি মাঝারি পরিমাণে আসল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।
ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি, সকালের নাস্তা বাদ দেওয়া মানেই বিশাল কোন অপরাধ। কিন্তু ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা আধুনিক জীবনধারার যুগে এসে এই ধারণাও অনেকটাই বদলে গেছে। সকালবেলা যদি আপনার খিদে না পায়, তবে জোর করে খাওয়ার কোনো মানে নেই। সবার শরীর এক নয়; তাই নিজের শরীরের সিগন্যাল শুনে যখন খিদে পাবে, তখনই পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।
ওজন কমানোর জন্য ক্যালোরি ডেফিসিট বা পরিমিত খাওয়া জরুরি ঠিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনাকে না খেয়ে থাকতে হবে। অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা ড্রাস্টিক ডায়েট শরীরের মেটাবলিজম কমিয়ে দেয় এবং হরমোনের বারোটা বাজায়। ফলে আপনি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত আচ্ছন্ন না হয়ে ‘ব্যাক টু বেসিকস’ বা সহজ জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সমাধান। ক্যালোরি নিয়ে সারাক্ষণ হিসাব কষে মাথা নষ্ট না করে, মন দিয়ে খাবার উপভোগ করুন, শরীরের সিগন্যাল শুনুন এবং হাসিখুশি থাকুন। কারণ জীবনটা শুধু ওজন মাপার যন্ত্রে সংখ্যা কমানোর জন্য নয়, বরং ভালোভাবে বাঁচার জন্য।
সূত্র: হেলথ লাইন, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউস অব হেলথ