নতুন মা-বাবা হওয়ার পর যখন নিজের চারপাশের অন্য অভিভাবকদের দেখেন, তখন মনে হতে পারে সবাই কত সুন্দর গুছিয়ে সব সামলাচ্ছেন। এদিকে নিজের অবস্থা দেখে মনে হয়, আপনি বোধ হয় কিছুই ঠিকঠাক পারছেন না। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, প্রত্যেক অভিভাবকেরই কিছু নিজস্ব গোপনীয়তা এবং শর্টকাট আছে। আর এগুলো তাঁরা কখনোই স্বীকার করতে চান না। ‘আদর্শ মা’ বা ‘বিচক্ষণ বাবা’ সেজে থাকাটা সহজ। কিন্তু আড়ালে আপনি যা করছেন, তা হয়তো আপনার নিজের মা-বাবাও একসময় করেছিলেন। আপনার সন্তানের মুখে হাসি থাকলে এবং সে সুস্থ থাকলে নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য কিছুটা ছাড় দেওয়াই যায়।
সব মা-বাবাই দিনের শেষে একজন মানুষ। তাঁরা মাঝেমধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ খেয়ে পরীক্ষা করেন সন্তানদের দেওয়া যাবে কি না, আবার কখনো রাগের মাথায় দেওয়া উপদেশের ঠিক উল্টোটা নিজেরা করেন। কিন্তু এই ছোটখাটো ফাঁকি বা গোপন কাজগুলোই তাঁদের কঠিন দিনগুলোকে কিছুটা সহজ করে তোলে। তাই নিজেকে অপরাধী না ভেবে বরং মেনে নিন—আপনিও সেই বিশাল অভিভাবক দলেরই একজন। যাঁরা কোনোমতে দিন পার করছেন এবং তবুও নিজেদের সন্তানদের প্রচণ্ড ভালোবাসেন।
গভীর ঘুমের অভিনয় এবং বাথরুমের ‘শান্তি’
বেশির ভাগ শিশুরই মাঝরাতে কান্না দিয়ে ঘুম ভাঙে। এ সময় ডায়াপার পরিবর্তন করতে হতে পারে। অনেক অভিভাবকই এ দায়িত্ব এড়াতে অনেক সময় নিছক ঘুমের ভান করে পড়ে থাকেন, যাতে অন্য সঙ্গীকে উঠতে হয়। এটি হয়তো কিছুটা লজ্জার। কিন্তু ভীষণ বাস্তব! আবার সারা দিন সন্তানের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে যখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন, তখন অনেক মা-বাবার একমাত্র অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে বাথরুম। অনেকেই বাথরুমে লুকিয়ে ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রল করা কিংবা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকাকে বেছে নেনে। এটিই তাঁদের দিনের শ্রেষ্ঠ ‘মি-টাইম’।
ছোট ছোট মিথ্যা আর চাতুরী
সন্তানকে ভোলাতে কত ছোটখাটো মিথ্যাই না বলতে হয়! ‘আইসক্রিমের দোকান আজ বন্ধ’ কিংবা ‘ফেরিওয়ালা আজ আসতে ভুলে গেছে’—এ রকম অজুহাত প্রায় সব পরিবারেই শোনা যায়। এমনকি সন্তানের খেলনা যদি খুব বেশি শব্দ করে, তবে তা রহস্যজনকভাবে বাড়ি থেকে হারিয়ে যায়। এমনকি কোনো অভিভাবকই জানেন না সেটি কোথায় গেল। অথচ দেখা যায়, সে খেলনাটি আপনিই লুকিয়ে রেখেছেন কিংবা ফেলে দিয়েছেন। স্ক্রিন টাইম নিয়ে হাজার নিয়ম থাকলেও নিজের জরুরি কাজের সময় সন্তানকে শান্ত রাখতে মোবাইল বা টিভি স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে দেওয়াটা এক অলিখিত গোপন নিয়ম।
দৈনন্দিন জীবনের আজব সব অভ্যাস
সন্তানকে খাবার খাওয়ানোর পর প্লেটে থেকে যাওয়া অংশ দিয়েই নিজেদের পেট ভরান অনেক মা-বাবা। আবার বাচ্চার ডায়াপার পরিষ্কার কি না, তা বুঝতে সেটি নাকের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করা তাদের কাছে একদম স্বাভাবিক হয়ে যায়। এমনকি যখন বাচ্চা সঙ্গে থাকে না, তখনো অনেককে দেখা যায় কোলের মধ্যে কাল্পনিক শিশুকে দোল দেওয়ার মতো করে অনবরত দুলছেন। বাইরে নিজের শিশুর মুখে কোনো দাগ দেখলে নিজের আঙুলে থুতু লাগিয়ে তা পরিষ্কার করার মতো কাজও অনেক অভিভাবক সবার অজান্তে করে থাকেন।
পড়াশোনা এবং নিজেদের দুর্বলতা
সন্তানের সহজ অঙ্ক মেলাতে গিয়ে যখন নিজেরা আঙুল গুনে হিসাব করেন, তখন ভেতরে ভেতরে একধরনের আতঙ্ক কাজ করে। তাঁরা মনে মনে ভাবেন, পাছে সন্তান বুঝে না ফেলে যে মা-বাবা নিজেই অঙ্ক পারছেন না। আবার সন্তান যখন খুব ভালোবেসে কোনো খাবার বানিয়ে সামনে আনে, তা হাসিমুখে খান। খাবার ভালো হলে তো ভালো কথা। আর যদি খেতে একেবারেই বিস্বাদ হয়, তবুও সেই খাবারের প্রতিটি লোকমা হাসিমুখে শেষ করার ভান করেন। এটাও এক বড় শিল্প।
কিছু মানবিক হিংসা এবং দুশ্চিন্তা
সন্তানহীন বন্ধুদের স্বাধীন জীবন দেখে মনে মনে কিছুটা হিংসা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তারা যখন নিজেদের ‘ক্লান্ত’ হওয়ার কথা বলে, তখন অনেক অভিভাবকই মনে মনে বিরক্ত হন। পাশাপাশি কাজ করে তীব্র দুশ্চিন্তা। অনেক সময় শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চার শ্বাস ঠিকমতো চলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের ঘুম ভেঙে ফেলার ঘটনাও বিরল নয়।
সবশেষে কিছু অদ্ভুত ভয়
কখনো কি মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আপনার শিয়রে সন্তানকে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন? এমন ভয় পাওয়াটাও অভিভাবকদের জীবনের অংশ। মাঝেমধ্যে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে স্কুল কামাই করিয়ে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সারা দিন বিছানায় শুয়ে কাটিয়ে দেন, এতেও কোনো লজ্জা নেই।
সূত্র: দ্য লিস্ট, মম ডটকম