হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

বাবা-মায়ের সঙ্গে অনিরাপদ সম্পর্ক প্রভাব ফেলে রোমান্টিক সম্পর্কে

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া

ছবি: পিক্সেল

জন্মের পর মায়ের সঙ্গে অনিরাপদ মানসিক সম্পর্ক পরবর্তী জীবনে রোমান্টিক সম্পর্কে কি কোনো প্রভাব ফেলতে পারে? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। প্রশ্ন হলো, অ্যাটাচমেন্ট কী? একে বাংলায় সংযোগ বলতে পারি। অ্যাটাচমেন্ট মানে গভীর, স্থায়ী ইমোশনাল বা আবেগীয় যোগাযোগ; যার দ্বারা একজন মানুষ আরেকজনের সঙ্গে সংযুক্তি অনুভব করে। এটা নিয়ে ব্রিটিশ সাইকো-অ্যানালিস্ট জন বোলবি অ্যাটাচমেন্ট থিওরি বা সংযুক্তি তত্ত্ব নামক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক তত্ত্ব প্রদান করেন ১৯৫০ সালে। তিনি বলেন, জীবনের প্রথম ছয় মাসে শিশুদের একজন প্রাথমিক সেবাদানকারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইমোশনাল বা আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি হওয়া প্রয়োজন। মা-বাবা কিংবা যে কেউ হতে পারেন এই প্রাথমিক সেবাদানকারী। শিশুটির স্বাভাবিক সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশে এই প্রাথমিক সেবাদানকারীর সঙ্গে সম্পর্কটি সারা জীবনের সম্পর্কের ছাঁচ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কী হয়

যখন একটি শিশু দৃঢ় আবেগীয় বন্ধনে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন সেটা শিশুর মনে একটি নিরাপদ বা সিকিউর অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করে। শিশুটি জীবনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু একটি শিশুর যদি দুর্বল আবেগীয় সম্পর্ক থাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে, তবে সেটা ইনসিকিউর অ্যাটাচমেন্ট বা অনিরাপদ সংযুক্তি তৈরি করে। এই শিশুটি অসহায়, ভয় এবং নেতিবাচক মাইন্ডসেটে বা মানসিকতায় সারাজীবন পার করবে। জন বোলবি বলছেন, ‘একটি শিশুকে যখন আলাদা করা হচ্ছে মা-বাবা থেকে, তখন শিশুটি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে নির্দিষ্ট কিছু আচরণ; যেমন কান্না, আঁকড়ে ধরা, খুঁজতে থাকা ইত্যাদি দ্বারা।’

ছবি: পিক্সেল

বিবর্তনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা আমাদের থেকে শক্তিশালী অথবা জ্ঞানী কারও কাছে আশ্রয় নিই। শিশুরাও এর ব্যতিক্রম নয়। ঠিক এই সময় শিশু তার প্রধান রক্ষাকারী বা প্রাইমারি কেয়ার গিভারের কাছে এসে আশ্রয় খোঁজে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের রোমান্টিক সম্পর্কেও ছাপ রাখে। অর্থাৎ একজন মানুষ দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত কীভাবে ভাববে, অনুভব করবে এবং আচরণ করবে তার ঘনিষ্ঠ আন্তসম্পর্কে; অবচেতন মনে তার শৈশবেই সেই জলছাপ তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে সংকটের সময় মানুষ কীভাবে আচরণ করবে, সেটারও নিদর্শন এই অ্যাটাচমেন্ট থিওরি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জন বোলবি বলছেন, ‘একজন মানুষ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের থেকে যেমন আচরণ পেয়েছে, সে অন্যদেরকে সেই আচরণই ফেরত দেবে বিশেষ করে স্ট্রেস মুহূর্তে। ঠিক এভাবেই শৈশবে শিশুর প্রত্যাশা তৈরি হয়, আস্থা-অনাস্থা তৈরি হয়, মন-মানসিকতা তৈরি হয়, বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি হয় ভবিষ্যতের জীবনসঙ্গী ও আন্তসম্পর্কগুলোর প্রতি। যাদের শৈশবে মানসিক চাহিদা অনুযায়ী যত্ন এবং মমতার পরিপূর্ণতা ছিল, তারা ভবিষ্যতে যখন তাদের মন খারাপ হবে বা কষ্ট পাবে, তখন অন্যের ওপর আস্থা রাখতে পারবে। আর যাদের এসব মানসিক চাহিদার ঘাটতি ছিল শৈশবে, তারা ভবিষ্যতে অন্যের ওপর আস্থা রাখতে পারবে না, বিশ্বাসহীনতায় ভুগবে।’

যেভাবে প্রভাব ফেলে

যদি মা বা প্রাথমিক সেবাদানকারীর সঙ্গে বন্ডিং দৃঢ় থাকে, তাহলে শিশুটি জানবে যে তার ফেরার নিরাপদ একটা জায়গা আছে। শিশুটি আত্মবিশ্বাসী, ইতিবাচক, স্বাধীন মানুষ হিসেবে তার চারপাশের পৃথিবীকে দেখবে। কিন্তু যদি এই বন্ডিং দৃঢ় না হয়, সেখানে গুটি গুটি পায়ে এসে ঢুকবে নিরাপত্তাহীনতাবোধ। এই শিশুর তখন দুই ধরনের মানসিকতা হতে পারে। হয় সে একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ হবে অথবা সে একজন পরিহারকারী বা পলায়নপর মানুষ হবে। এই দুই ধরনের মানুষ অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না, নিজেকে গুটিয়ে ফেলে, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং নেতিবাচক মানসিকতায় ভোগে।

ছবি: পিক্সেল

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রভাব

দুটি মুখ্য ভূমিকা রাখে। প্রথমত, এর ওপর নির্ভর করে আমরা রোমান্টিক সম্পর্কে কীভাবে জড়াব। দ্বিতীয়ত, প্রিয় মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে আবেগীয়ভাবে প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেখাব। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে দুটি মাত্রা দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো অ্যাভয়ডেন্স বা পরিহারপ্রবণতা; যা ব্যক্তি তার আন্তসম্পর্কে কতটুকু অন্তরঙ্গতা এবং ঘনিষ্ঠতার দাবি করে, তার মান নির্ধারণ করে। যারা উচ্চমাত্রায় পরিহারপ্রবণ অথবা হাইলি অ্যাভয়ডেন্ট মানুষ, তাদের রোমান্টিক সঙ্গীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব থাকে। পক্ষান্তরে নিজের প্রতি সচরাচর ইতিবাচক কিন্তু কিছুটা ভঙ্গুর ভাবনা থাকে। পরিহারপ্রবণ মানসিকতার অধিকারী ব্যক্তির প্রচেষ্টা থাকে তার রোমান্টিক সম্পর্কে স্বাতন্ত্র্য এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। কারণ, রোমান্টিক সঙ্গীর কাছ থেকে তার মানসিক বা আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা চাওয়া অবচেতনভাবেই সম্ভব হয় না। তাদের আন্তসম্পর্কে দূরত্ব থাকে। এবার দ্বিতীয় মাত্রা হলো দুশ্চিন্তা। অবচেতনভাবে তারা মনে করে, তার প্রচেষ্টা রোমান্টিক জীবনসঙ্গী গ্রহণ করবে না অথবা তাকে পরিত্যাগ করবে। ফলে তারা আন্তসম্পর্কটির ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ধরনের মানুষ তাদের রোমান্টিক সম্পর্কে নিজেকে বিশালভাবে বিনিয়োগ করে। শুধু তা-ই নয়, তারা আকুল হয়ে থাকে তাদের রোমান্টিক সঙ্গী থেকে আবেগীয় উচ্ছ্বাস গ্রহণে। সাধারণত এই ঘরানার মানুষের নিজেদের সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও তারা তাদের রোমান্টিক সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে। রোমান্টিক সম্পর্কে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তারা নিজে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে এবং রোমান্টিক সঙ্গীকে হারানোর ভয়ে তটস্থ থাকে। ফলে তাদের মধ্যে সব সময় সঙ্গীকে হারাই হারাই একটা ভাব থাকে। আর ঠিক এ কারণেই এহেন মানসিকতার মানুষেরা সব সময় দুশ্চিন্তায় ভোগে। শুধু তা-ই নয়, নিজেকে তারা এত বেশি উজাড় করে দেয় যে সম্পর্কে আত্মতৃপ্তির অবকাশও তাদের কমে যায়। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যাদের দুশ্চিন্তা কম, তারা সিকিউর অ্যাটাচমেন্টের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। গবেষণালব্ধ উপাত্ত বলে, নারীদের দুশ্চিন্তার প্রবণতা বেশি এবং পুরুষদের পরিহারপ্রবণতা বেশি।

বাবা-মায়ের করণীয় কী

নিচের অভ্যাসগুলোর নিয়মিত চর্চা শুরু করতে পারেন:

১. শিশুকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে মনোযোগ দিন।

২. শিশু যখন আপনাকে কিছু বলতে আসে তখন সব কাজ থামিয়ে শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনি ব্যস্ত থাকলে বলুন, ৫ মিনিট শুনব, তারপর আমি অন্য কাজ করব।

৩. শিশুর প্রাইভেসিকে গুরুত্ব দিন।

৪. শিশুর মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না।

৫. কখনোই সন্তানকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না।

৬. আপনার সঙ্গে মতবিরোধ হলে শান্তভাবে তার মতামত শুনতে চান।

৭. সন্তানের ওপর আপনার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

সঙ্গীর নাক ডাকায় ঘুম ভাঙে? জেনে নিন ৭ টিপস

আজকের রাশিফল: স্ত্রীর পরামর্শে ভাগ্য খুলবে, চারপাশের মানুষ ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে

খুশকির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ভেষজ তেল

আজকের রাশিফল: নববিবাহিতদের জন্য সুখবর অপেক্ষা করছে, ছোটদের পরামর্শও কাজে লাগবে

ঘরে পোকামাকড় প্রবেশ রোধের উপায়

আজকের রাশিফল: প্রেমে ‘পজেসিভ’ হলে বিবাদ বাড়বে, মোবাইল-মানিব্যাগ সাবধান

যে ৩ কারণে চাকরি থেকে বাদ পড়ছে জেন-জি প্রজন্মের কর্মীরা

আঙুলের ডগা থেকে অনবরত চামড়া উঠছে? জেনে নিন, উঠলে কী করবেন

‘সানবার্ন’ বনাম ‘সান পয়জনিং’—রোদে ত্বকের সুরক্ষায় যা জানা জরুরি

ইতিহাসের সঙ্গে নিজেকে ফ্রেমে বাঁধার দিন