একটি বানর যখন গাছে চলাফেরা করে, সে কিন্তু বর্তমানের ডালটি ছেড়ে দেওয়ার আগেই অন্য হাত দিয়ে পরের ডালটি শক্ত করে ধরে। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঠিক এমন একটি প্রবণতা দেখা যায়। যাকে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হচ্ছে মাঙ্কি ব্রাঞ্চিং। সহজ কথায়, বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার আগেই নিজের একাকিত্ব দূর করতে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কের ডালপালা গুছিয়ে রাখা। অনেকে একে এক্সিট অ্যাফেয়ার বা বিচ্ছেদের প্রস্তুতিমূলক প্রেমও বলে থাকেন।
আপনার সঙ্গী কি মাঙ্কি ব্রাঞ্চিং করছেন? বুঝবেন কীভাবে? এটি সাধারণ প্রতারণার চেয়ে কিছুটা আলাদা। কারণ, এখানে ব্যক্তি কেবল সাময়িক আনন্দের জন্য নয়, বরং পুরোনো সম্পর্ক থেকে বের হয়ে সরাসরি নতুন ডাল ধরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মাঙ্কি ব্রাঞ্চিংয়ের পেছনে নিষ্ঠুরতার চেয়ে নিজের হীনম্মন্যতা ও ভয় বেশি কাজ করে। অনেকে একমুহূর্তও সঙ্গীহীন থাকতে পারেন না। একাকিত্ব তাঁদের কাছে নরকযন্ত্রণা মনে হয়। তাই ব্যাকআপ হিসেবে সব সময় কাউকে তৈরি রাখেন।
আবার অনেকেই ভোগেন হীনম্মন্যতা ও নিরাপত্তাহীনতায়। যাঁদের আত্মবিশ্বাস কম, তাঁরা মনে করেন, সঙ্গী ছাড়া তাঁদের কোনো মূল্য নেই। তাই একজনের কাছ থেকে মনোযোগ কমার আগে তাঁরা অন্য কারও মনোযোগ খুঁজতে শুরু করেন। বর্তমান সম্পর্কের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে তা ঠিক করার চেয়ে নতুন কারও সঙ্গে সময় কাটানো সহজ মনে হয় তাঁদের কাছে। যাঁদের মানসিক গড়ন অ্যাংজাস বা অ্যাভয়েডেন্ট, তাঁরা নিরাপত্তার জন্য সব সময় একটি সেফটি নেট বা বিকল্প খুঁজে বেড়ান।
আবেগীয় দূরত্ব: সঙ্গী আগের মতো আপনার প্রতি আগ্রহী নন। কথা বললেও মনে হয় তিনি অন্য কোথাও ডুবে আছেন।
হুট করে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া: নতুন কোনো অফিস ইভেন্ট বা নতুন শখ তৈরি হওয়া এবং আপনার সঙ্গে সময় কাটানোকে বাড়তি আপদ মনে করা।
নতুন বন্ধুর নাম বারবার আসা: হুট করে নতুন কলিগ বা জিম পার্টনারের কথা সব সময় মুখে লেগে থাকা।
মোবাইল ফোন নিয়ে অতি গোপনীয়তা: পাসওয়ার্ড বদলে ফেলা, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন লুকিয়ে রাখা কিংবা কার সঙ্গে কথা বলছে জানতে চাইলে রেগে যাওয়া।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনীহা: আগে আপনাদের যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল, তা থেকে তিনি সুকৌশলে পিছিয়ে যাচ্ছেন।
অকারণে ঝগড়া: নিজের অপরাধবোধ কমাতে আপনার ওপর দোষ চাপানো এবং ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করে বিচ্ছেদের পথ তৈরি করা।
এটি কি প্রতারণা
অনেকে মনে করেন, যতক্ষণ না শারীরিক সম্পর্ক হচ্ছে, ততক্ষণ এটি প্রতারণা নয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং স্বচ্ছতা। যখন কেউ সঙ্গীকে না জানিয়ে অন্য কারও সঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা করেন বা আবেগ ভাগাভাগি করেন, তাকে ইমোশনাল চিটিং বা আবেগীয় প্রতারণা বলা হয়। এটি সাধারণ প্রতারণার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে। কারণ, এখানে সঙ্গী মানসিকভাবে আপনাকে অনেক আগেই প্রতিস্থাপন করে ফেলেছেন।
সাবেক সঙ্গী কীভাবে তাঁর নতুন সঙ্গীর সঙ্গে ভালো আছেন, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখার চেষ্টা করবেন না। এতে ক্ষত বাড়বে। নিজেকে নিরাময় করতে তাঁকে সব জায়গা থেকে ব্লক করুন।
আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে নিজের শখ, কাজ এবং বন্ধুদের সময় দিন। প্রয়োজনে থেরাপিস্টের সাহায্য নিন।
নতুন মানুষটির সঙ্গে নিজের তুলনা করা মানে নিজের সঙ্গে অন্যায় করা। আপনার সাবেক নতুন কাউকে পেয়েছেন মানেই তিনি অন্য স্তরে পৌঁছে গেছেন, এমন নয়। বরং তিনি একা থাকতে ভয় পান বলে নতুন কাউকে আঁকড়ে ধরেছেন।
যেকোনো সম্পর্ক শেষ হওয়া কষ্টের। কিন্তু বিচ্ছেদের আগেই অন্য কারও ওপর বাজি ধরা কেবল অনৈতিকই নয়, নিজের ব্যক্তিত্বের দুর্বলতার পরিচয়। একটি সুন্দর ও সুস্থ সম্পর্কের জন্য একা থাকতে শেখা এবং নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে পারাটা বড় শক্তি। মাঙ্কি ব্রাঞ্চিং নয়, বরং সততার সঙ্গে একটি ডাল ছেড়ে অন্য ডাল ধরার নামই হলো প্রকৃত পরিণত মানসিকতা।
সূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ, সাইকোলজি টুডে