কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একদিন মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে—এই আশঙ্কা বেশ কয়েক বছর ধরে তীব্র হয়েছে। বাস্তবতা হলো, সেই ভবিষ্যৎ যেন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ কাজ প্রতিস্থাপন করতে সক্ষম। গবেষকেরা ‘আইসবর্গ ইনডেক্স’ নামে একটি বিশেষ টুল ব্যবহার করে ১৫ কোটি মার্কিন কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং দেখেছেন কোন কোন পেশায় মানুষের জায়গা এআই নিতে পারে।
এআই যেমন মানুষের কাজ দখল করছে, তেমনি নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জরিপে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীর সংখ্যা কমাতে পারে। তবে বড় ডেটা, ফিনটেক ও এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তি খাতে চাকরির সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিচে কিছু প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করা হলো, যারা ইতিমধ্যে এআই দিয়ে মানুষের কাজ প্রতিস্থাপন করেছে বা সেই পথে হাঁটছে।
এইচপি
এআই-ভিত্তিক উদ্যোগের কারণে করপোরেট পর্যায়ে কর্মীর সংখ্যা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচপি। ২০২৮ সালের মধ্যে ৪ থেকে ৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এআই গ্রহণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হবে।
আইবিএম
যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অরবিন্দ কৃষ্ণা দ্য ওয়াল স্ট্রেট জার্নালকে জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগে শতাধিক কর্মীর কাজ ইতিমধ্যে এআই দিয়ে করানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে আরও কয়েক হাজার কর্মী ছাঁটাই হতে পারে। তবে নতুন প্রযুক্তি ও কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের জন্য নিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পাঁচ বছরে মানবসম্পদের মতো বিভাগে প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে।
আমাজন
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানটিতে এআই-নির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে কর্মীর সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাঁটাই মূলত সাংগঠনিক সংস্কৃতি পুনর্গঠনের অংশ বলে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে। আমাজন এআইকে উদ্ভাবন বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে দেখছে।
সেলসফোর্স
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্লাউড-ভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্স। এর গ্রাহক সহায়তা বিভাগে এআই এজেন্ট ব্যবহার করছে। এর ফলে কর্মীর সংখ্যা ৯ হাজার থেকে কমে প্রায় ৫ হাজারে চলে এসেছে। তবে নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন পড়েনি এবং শত শত কর্মীকে অন্যান্য বিভাগে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
ক্লারনার
প্রতিষ্ঠানটিতে গত চার বছরে ক্লারনারের কর্মীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং আগামী বছরগুলোতেও কমতে পারে। বর্তমানে ক্লারনায় প্রায় ৩ হাজার কর্মী আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ হাজারের নিচে নামতে পারে। ২০২২ সালে কর্মীর সংখ্যা ছিল ৭ হাজার। যেখানে ‘মানবিক সংযোগ’ গুরুত্বপূর্ণ, সেই কাজগুলোতে মানুষ অপরিবর্তিত থাকবে। এআই সহকারী বর্তমানে ৮৫৩ জন কাজ করতে সক্ষম। এতে বছরে প্রায় ৫৮ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হচ্ছে।
ফাইভার
এটি ফ্রিলেন্সারদের জন্য গঠিত একটি অনলাইন মার্কেট প্লেস। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি মোট কর্মীর প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। এই পদক্ষেপ ফাইভারকে আরও এআই নির্ভর কোম্পানিতে রূপান্তরিত করবে। কফম্যান বিজনেস ইনসাইডারকে জানান, ফাইভার ভবিষ্যতে শুধু সেই লোকদের নিয়োগ দেবে যাঁরা এআই ব্যবহার করতে জানেন।
ওয়াইজটেক
লজিস্টিক সফটওয়্যার নির্মাতা ওয়াইজটেক ২ হাজার জন বা ৩০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করছে। সিডনি-ভিত্তিক এই কোম্পানিতে অক্টোবরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৭ হাজার কর্মী কাজ করত।
এআই এখন কোড লেখা থেকে গ্রাহকসেবা পর্যন্ত মানুষের কাজের জায়গা দখল করছে। ভবিষ্যতে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীর অর্ধেককে ছাটাই করতে বাধ্য হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিজনেস ইনসাইডার