হোম > চাকরি > ক্যারিয়ার পরামর্শ

১৮তম বিজেএস: প্রথমবার ব্যর্থ, দ্বিতীয়বারে প্রথম হলেন সিয়াম

আরিফুল করিম সিয়াম পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। তিনি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) সহকারী জজ পরীক্ষায় প্রথম (সুপারিশপ্রাপ্ত) স্থান অধিকার করেছেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন দীন ইসলাম।

দীন ইসলাম

আরিফুল করিম সিয়াম।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সন্তান আরিফুল করিম সিয়াম। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর পরিবার নওগাঁয় বসবাস করতেন। সিয়াম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের (৪১তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী ছিলেন।

প্রথমবার ব্যর্থ

প্রথমবার ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় অংশ নেন সিয়াম। তবে সেই পরীক্ষায় সফল হতে পারেননি। প্রিলিমিনারি থেকে বাদ পড়ে যান। এরপর নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করেন। গুছিয়ে নিতে থাকেন নিজের পড়াশোনা ও প্রস্তুতির পরিকল্পনা।

সিয়াম প্রতিদিন নিজের পড়াশোনার অগ্রগতি যাচাই করতেন। কোনো দিন কম পড়া হলে পরের দিন তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি বলেন, ‘এক দিনে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে কতটুকু পড়ব, কোন মডেল টেস্ট দেব, সেটি আগের দিনই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতাম। এভাবে প্রতিদিন নিজের রুটিন ঠিক করে নিতাম এবং প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত সময় দিতাম।’

পড়াশোনার নির্দিষ্ট সময় ছিল না

পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় বেঁধে রাখতেন না সিয়াম। তিনি বলেন, ‘যদি ঘুম পেত, ঘুমিয়ে যেতাম। যদি ঘুম না পেত, পড়াশোনা করতাম। আবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাও দিয়েছি, খেলাধুলাও করেছি।’ সিয়াম একটি বিতর্ক ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

প্রথম হওয়ার অনুভূতি

পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নেন সিয়াম। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে পাওয়া এই সাফল্য নিয়ে সিয়াম বলেন, ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে আমাকে সফল করেছেন। তবে আমার এই যাত্রাটা সহজ ছিল না। এটা ছিল আমার দ্বিতীয়বারের চেষ্টা। প্রথমবার যখন চেষ্টা করেছিলাম, ১৭তম বিজেএস পরীক্ষায় আমি দুর্ভাগ্যবশত প্রিলিমিনারি থেকে বাদ পড়ে যাই। এরপর আবার নতুন করে শুরু করা, নতুন করে সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া, নতুন করে পরিশ্রম করা এবং নিজেকে আবার নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া—সবকিছু করতে হয়েছে। এরপর ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সফলতা পেয়েছি।’

যাঁদের অনুপ্রেরণায় সহকারী জজ

নিজের এগিয়ে যাওয়ার পথে পরিবারের অবদানের কথা জানান সিয়াম। তিনি বলেন, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে আমার পরিবার। আমি খুবই মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সন্তান। আমার মা-বাবা আমাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন দেখতেন। তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি চেষ্টা করেছি, যাতে ভালো কিছু করতে পারি।’

সিয়াম বলেন, ‘আমি যখন ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিই, তখন নওগাঁ জিলা স্কুল থেকে ডিস্ট্রিক্ট ফার্স্ট হয়েছিলাম। তখন আমার মা-বাবা আমাকে একবার জড়িয়ে ধরেছিলেন। আসলে ছেলেরা বড় হয়ে গেলে মা-বাবাকে খুব বেশি জড়িয়ে ধরার সুযোগ পায় না। কোনো একটি অর্জনের কারণে বাবাকে খুশি করে, সেই বাবা নিজে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবেন—এটা আমার খুব চাওয়া ছিল।’

অ্যাকাডেমিক সাফল্যের মাধ্যমে মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে উচ্ছ্বসিত সিয়াম। কাঙ্ক্ষিত অর্জনের পর পরিবারেও নেমে এসেছে আনন্দের আবহ। ফল প্রকাশের পর মা-বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। এটি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় চাওয়া ছিল বলে জানান সিয়াম। সন্তানের এই সাফল্যে তাঁর মা-বাবাও অত্যন্ত গর্বিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন।

সুখ-দুঃখের সঙ্গী

সিয়ামের জীবনের পথচলায় একজন ১১ বছরের বন্ধু আছেন। জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ-সুখের অনেক মুহূর্তের সাক্ষী তিনি। বই কেনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কোচিংয়ে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও বন্ধুটি সিয়ামকে সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া বন্ধুর বাবাও বিভিন্নভাবে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। নিজের পরিবারও সব সময় তাঁর পাশে ছিল। মা-বাবার পাশাপাশি দুই বোনও তাঁকে নিয়মিত উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন।

নতুনদের পরামর্শ

নতুনদের উদ্দেশে সিয়াম বলেন, ‘সামনে যাঁরা পরীক্ষা দেবেন, তাঁদের প্রতি আমার বার্তা; নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার ওপর সর্বোচ্চ ভরসা রাখুন। আমি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতাম এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে চাইতাম। পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাটাও নিয়মিত করতাম।’

সিয়াম আরও বলেন, ‘নিজের পড়াশোনা সেভাবে গুছিয়ে নিয়ে চলতে হবে। পড়াশোনা এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া—এই দুই বিষয়ের সমন্বয় যদি কেউ করতে পারে, তাহলে শ্রমের ফল ইনশা আল্লাহ একদিন না একদিন পাওয়া যাবে।’