আজকের আধুনিক যুগে মানুষের জীবনের অধিকাংশ মানসিক অস্থিরতা, হতাশা ও অশান্তি ঘুরেফিরে চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়—রিজিক বা জীবিকার দুশ্চিন্তা, স্রষ্টার হক আদায়ে অবহেলা, মৃত্যুকে ভুলে থাকা এবং সর্বক্ষণ আল্লাহ আমাকে দেখছেন—এই অনুভূতির অভাব।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের প্রখ্যাত তাবেয়ি ও আধ্যাত্মিক সাধক ইমাম হাসান বসরি (রহ.) মানবজীবনের এই মানসিক সংকটগুলোর অত্যন্ত সুন্দর ও কার্যকর সমাধান দিয়ে গেছেন। শতাব্দীকাল ধরে মুসলিম বিশ্বে তাঁর উপদেশগুলো আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার অনন্য শিক্ষা হিসেবে সমাদৃত। এই চার মূলমন্ত্র মূলত কোরআন ও সহিহ্ হাদিসেরই শাশ্বত বার্তার প্রতিধ্বনি।
ইমাম হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘যখন থেকে আমি জানতে পারলাম যে আমার রিজিক ও জীবিকা নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে, যা কোনো অবস্থাতেই কমবে বা বাড়বে না; তখন থেকেই আমি রিজিকের অতিরিক্ত চিন্তা ত্যাগ করেছি।’
রিজিকের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। মানুষের আসল দায়িত্ব হলো হালাল উপায়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। রিজিকের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের ইমানকে দুর্বল করে, পক্ষান্তরে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) অন্তরে অলৌকিক প্রশান্তি এনে দেয়।
ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর দ্বিতীয় নীতিটি ছিল, ‘যখন আমি অনুধাবন করলাম যে আমার ওপর আল্লাহর কিছু হক ও দাবি রয়েছে—যা আমি ছাড়া অন্য কেউ পূরণ করতে পারবে না; তখন থেকেই আমি সেই হক আদায়ের কাজে নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেছি।’
মৃত্যুর পর কোনো স্বজন, পরিবার কিংবা সমাজ কারও হয়ে আল্লাহর হক আদায় করে দেবে না। তাই নামাজ, রোজা, জাকাত ও সৎকাজের মাধ্যমে নিজের আমলনামা নিজেকেই সমৃদ্ধ করতে হবে।
জীবনের কঠিনতম সত্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো অবস্থাতেই মুক্তি পাওয়া যাবে না; তখন থেকেই আমি মৃত্যুর পরপারের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি।’
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং ক্ষণস্থায়ী এই পার্থিব জীবনের একমাত্র পরিসমাপ্তি। সত্যিকারের বুদ্ধিমান তিনিই, যিনি ক্ষণিকের দুনিয়ার পাশাপাশি চিরস্থায়ী আখিরাতের পাথেয় গোছাতে ব্যস্ত থাকেন।
চতুর্থ ও চূড়ান্ত মূলমন্ত্র হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘যখন আমি অনুধাবন করলাম যে আমার একজন রব আছেন, যিনি আমার সমস্ত গোপন ও প্রকাশ্য কাজের খবর রাখেন; তখন থেকেই আমি সেসব কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, যার জন্য কিয়ামতের দিন তাঁর মহান দরবারে আমাকে লজ্জিত হতে হবে।’
ইসলামের পরিভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ইহসান’। অর্থাৎ এমন এক ইমানি অনুভূতি, যেখানে বান্দা মনে করে সে আল্লাহকে দেখছে; আর তা না হলেও অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে—আল্লাহ তাকে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছেন।