প্রকৃতি ও পরিবেশ মহান আল্লাহর এক অপার নিয়ামত। আসমান-জমিন, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, বৃক্ষলতা এবং প্রাণিজগৎ—সবকিছুর সমন্বয়ে মহান রাব্বুল আলামিন এই পৃথিবীকে ভারসাম্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে পরিবেশরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আমি আকাশসমূহ ও পৃথিবী এবং এ দুইয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি এগুলো যথাযথ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা দুখান: ৩৮-৩৯)। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান—মাটি, পানি, বায়ু এবং জীববৈচিত্র্য একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই সুশৃঙ্খল সহাবস্থান আল্লাহর এক অসাধারণ শিল্পকর্ম।
মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এই প্রতিনিধিত্বের মূল দায়বদ্ধতা হলো পৃথিবীর আমানত রক্ষা করা। আধুনিক বিশ্বে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণ মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে, তখন ইসলামপ্রদত্ত পরিবেশ সুরক্ষার নির্দেশনাগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সুরা রুম-এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন সমুদ্র ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ অর্থাৎ পরিবেশের আজকের এই সংকটের মূলে রয়েছে মানুষেরই প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ড।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসলাম বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি ভালো কাজ নয়, বরং এটিকে ইবাদত ও ‘সদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে গণ্য করেছে। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বৃক্ষরোপণের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, অথচ তোমার হাতে একটি গাছের চারা আছে, তবে সেটি রোপণ করে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ লাগায় অথবা চাষাবাদ করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা পশু কিছু ভক্ষণ করে, তবে তা রোপণকারীর জন্য সদকার সওয়াব হবে। (সহিহ বুখারি)। এমনকি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও নবীজি (সা.) গাছ কাটতে বা পুড়িয়ে দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। বর্তমান সময়ে যখন নির্বিচারে বন উজাড় করা হচ্ছে, তখন নবীজি (সা.)-এর এই শিক্ষা পৃথিবীর সবুজায়ন ও অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষায় এক অনন্য পাথেয়।
পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো প্রাণিজগৎ। ইসলামে অকারণে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা বা কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়ুই পাখি হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক ব্যক্তির জান্নাত পাওয়া এবং একটি বিড়ালকে আটকে রেখে ক্ষুধার্ত অবস্থায় মেরে ফেলায় এক নারীর জাহান্নাম যাপনের ঘটনা থেকে পশুপাখির অধিকার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সদস্যের প্রতি মমতা প্রদর্শন করাকে ইসলাম ইমানের অংশ হিসেবে দেখে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে আমাদের ইসলামের পরিবেশনীতির দিকে ফিরে আসা জরুরি। কলকারখানার ধোঁয়া কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তির ওপর জোর দেওয়া এবং ব্যাপক হারে বনায়ন করা এখন সময়ের দাবি। মসজিদের মিম্বর থেকে ইমাম ও খতিবদের উচিত পরিবেশ সচেতনতায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
পৃথিবী আল্লাহর আমানত। একে রক্ষা করা আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যদি নবী (সা.) নির্দেশিত পরিবেশরক্ষার নীতিমালা মেনে চলি, হয়তো এই পৃথিবীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও সুন্দর রাখা সম্ভব হবে।