জুমাবার একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, ইমানি চেতনা ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান মসজিদে সমবেত হয়ে এ দিন আল্লাহর ইবাদত করেন। কিন্তু এই ইবাদতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে নবুওয়াতের শুরুর যুগে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রথম ১৩ বছর কেটেছে মক্কায়। সে সময় মুসলমানরা ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও নির্যাতিত। কোরাইশরা ইসলামের অনুসারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত। প্রকাশ্যে ধর্মীয় সমাবেশ করার মতো স্বাধীনতা তাদের ছিল না। ফলে মুসলমানরা গোপনে দারুল আরকামে অথবা নির্জন স্থানে ইবাদত করতেন। এ জন্যই মক্কার যুগে জুমার নামাজ ফরজ করা হয়নি। কারণ জুমার জন্য একটি স্বাধীন পরিবেশের প্রয়োজন ছিল, যা তখন মুসলমানদের জন্য সম্ভব ছিল না।
নবুওয়াতের একাদশ ও দ্বাদশ বছরে আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইআতের মাধ্যমে ইয়াসরিব (বর্তমান মদিনা)-এর বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের কোরআন শিক্ষা ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে মদিনায় পাঠান।
মুসআব (রা.)-এর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মদিনায় ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটে। মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তারা সপ্তাহে এক দিন একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনি আলোচনা করার প্রয়োজন অনুভব করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে সেখানে জুমার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম জুমার সূচনা ঘটে। (সুনানে আবু দাউদ: ১০৬৯)
অধিকাংশ সিরাতবিদ ও মুহাদ্দিসের মতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিনিধি হিসেবে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) মদিনায় প্রথম জুমার নামাজ আদায় করান।
অন্যদিকে কিছু বর্ণনায় এসেছে, মদিনার আনসার সাহাবি আসআদ ইবনে জুরারা (রা.) তাঁর নিজ এলাকার মুসলমানদের নিয়ে প্রথম জুমার আয়োজন করেন। উভয় বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করে বলা হয়, মুসআব (রা.)-এর তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় আসআদ ইবনে জুরারা (রা.) স্থানীয়ভাবে এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই উভয়ের অবদানই ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়।
প্রথম জুমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল মদিনার বনু বায়াজা গোত্রের ‘নাকিউল খাজিমাত’ নামক স্থানে। সেখানে মুসলমানরা একত্র হয়ে জামাতে জুমার নামাজ আদায় করেন।
এ জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লির সংখ্যা সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। কোনো বর্ণনায় ৪০ জন, আবার কোনো বর্ণনায় ১২ জনের উল্লেখ পাওয়া যায়। (দারে কুতনি: ১৫৮৫)
যদিও মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের আগেই সাহাবায়ে কেরাম জুমা আদায় করেছিলেন, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথম জুমা আদায় করেন হিজরতের সময়।
মক্কা থেকে হিজরত করে তিনি প্রথমে কুবায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর শুক্রবার কুবা থেকে মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে বানু সালিম ইবনে আওফ গোত্রের ‘ওয়াদি রানুনা’ নামক স্থানে জুমার সময় হলে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন এবং সাহাবিদের নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন। এটিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত প্রথম জুমা।
ইসলামের প্রথম জুমা ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। মক্কার নির্যাতন থেকে মদিনার স্বাধীন পরিবেশে এসে মুসলমানরা প্রথমবারের মতো সম্মিলিতভাবে সাপ্তাহিক এ ইবাদত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং সেই ধারাকে আরও সুদৃঢ় করেন।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।