হোম > ইসলাম

ইসলামে কারাবন্দীর যত অধিকার

ইজাজুল হক

ইসলাম কারাবন্দীদের মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। যুগে যুগে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞগণ ফিকহের কিতাবসমূহে এসব বিধান লিখে গেছেন। ইসলামের সোনালি যুগে মুসলিম শাসকগণ তা বাস্তবায়নও করেছেন। মানুষের সম্মান, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত এসব যুগপৎ বিধান সমকালীন বিশ্বের কাছেও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য। বন্দীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে এবং কারাগারে তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে ইসলামের নির্দেশনা সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা হলো—

বন্দীদের যেসব শাস্তি দেওয়া যাবে না
কারাগারে বন্দীদের কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার বৈধতা দেয় না ইসলাম। ফকিহগণ এ বিষয়ে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন। যথা—

» বন্দীর অঙ্গ বিকৃত করে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বন্দীর কোনো অঙ্গ ভেঙে ফেলা, কেটে ফেলা, ছিঁড়ে ফেলা, উপড়ে ফেলা, জখম করা ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘অঙ্গ বিকৃত কোরো না।’ (মুসলিম: ১৩৫৭)

» এমন কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না, যাতে বন্দীর সম্মানহানি হয় বা শারীরিক-মানসিক ক্ষতি হয়। যেমন—বন্দীর মুখে আঘাত করা যাবে না, ঘাড়ে বেড়ি পরানো যাবে না এবং মাটিতে শুইয়ে পেটানো যাবে না। এসব পদ্ধতিতে শাস্তি দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।

» আগুনজাতীয় কিছু দিয়ে শাস্তি দেওয়া, শ্বাসরোধ করা, পানিতে চোবানো ইত্যাদি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে এমন কাজের বদলা ও কিসাস হিসেবে হলে বৈধ। অর্থাৎ, বন্দী যদি কাউকে এসব অপরাধের মাধ্যমে কষ্ট দেয়, তবে তাকে একইভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে। এটিই ইসলামের সুবিচার।

» ক্ষুধা ও ঠান্ডায় কষ্ট দেওয়া যাবে না। একইভাবে ক্ষতিকর বা কষ্টকর খাবার খেতে বাধ্য করেও শাস্তি দেওয়া যাবে না। পোশাক পরতে নিষেধ করে শাস্তি দেওয়াও ইসলাম অনুমোদন করে না। এসব কারণে বন্দী মারা গেলে দায়ী ব্যক্তি থেকে কিসাস বা রক্তপণ আদায় করার নির্দেশ রয়েছে।

» বন্দীকে জামাকাপড় খুলে উলঙ্গ করা যাবে না। কারণ এতে বন্দীর সম্মানহানি হয় এবং তা তার শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কারণ হয়।

» প্রাকৃতিক প্রয়োজন, অজু-গোসল ও নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া যাবে না।

» কোনো নারী শিশুসন্তানসহ বন্দী হলে সন্তানকে তার থেকে আলাদা করা যাবে না। হাদিসে এসেছে, আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি (বন্দী) মা থেকে সন্তানকে আলাদা করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার থেকে তার প্রিয়জনদের আলাদা করবেন।’ (তিরমিজি: ১৫৬৬) 

কারাগারের পরিবেশ কেমন হবে
কারাগারের পরিবেশ কেমন হবে, তা নিয়েও ফকিহগণ বিশদ আলোচনা করেছেন। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরা হলো—

» কারাগার মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে হবে। তাতে এমন সব উপকরণ থাকতে হবে, যা একজন সুস্থ-সবল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন। বন্দীকে প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন এবং আলো-বাতাস আসে এমন কক্ষে রাখতে হবে। একই কক্ষে বা স্থানে ধারণক্ষমতার বেশি বন্দীকে রাখা জায়েজ হবে না।

» বন্দীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও তাদের চিকিৎসার জন্য একটি চিকিৎসক দল রাখতে হবে। ফলে তাদের বাইরের হাসপাতালে যেতে হবে না এবং মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হতে হবে না।

» পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকলে কয়েদির কক্ষে তালা দেওয়া, তাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রাখা বা অন্য কোনোভাবে শারীরিক-মানসিক কষ্ট দেওয়া জায়েজ না। একইভাবে আত্মীয়স্বজনকে তার সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়াও অনুচিত। কারণ এসব তার সুস্থতার অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান।

» বন্দীকে স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে তাদের যৌন চাহিদা পূর্ণ করার সুযোগ দিতেও উৎসাহ দেয় ইসলাম।

» কারাগারে অবশ্যই অজু-গোসলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি সুস্থতার অপরিহার্য উপাদান।

» কারাগারের পরিবেশ সার্বক্ষণিক তদারক করতে হবে। কোনো ধরনের মানবাধিকার থেকে যেন বন্দীরা বঞ্চিত না হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের কড়া নজর রাখতে হবে। বন্দীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করতেও উৎসাহিত করে ইসলাম। এক আব্বাসি খলিফা বন্দীদের ১ হাজার ৪০০ দিনার ভাতা দিতেন। 

অসুস্থ বন্দীর চিকিৎসার বিধান
» প্রথম কথা হলো, অসুস্থ মানুষকে বন্দী করা যাবে কি না—এ বিষয়ে ফকিহগণ বলেছেন, পরিস্থিতি বুঝে বিচারককেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। কতটুকু অসুস্থ হলে বন্দীর কারাগারে থাকতে সমস্যা হবে এবং কতটুকু হলে সমস্যা হবে না, তা বিচারক বন্দীর অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। কারাগারে পাঠালেও যদি বন্দীর চিকিৎসা করা যায় এবং কোনো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তবে তাকে কারাগারে পাঠানো যাবে। অন্যথায় তাকে কারাগারে বসবাস করার মতো সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত যোগ্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে।

» বন্দী যদি কারাগারে অসুস্থ হয় এবং সেখানেই চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে, তবে সেখান থেকে বের করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে তার সেবা-শুশ্রূষা ও চিকিৎসার জন্য বাইরে থেকে কেউ আসতে চাইলে নিষেধ করা যাবে না। বিনা চিকিৎসায় এমন অসুস্থ বন্দী মারা গেলে দায়ী ব্যক্তিকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। একবার মহানবী (সা.) শিকল পরা এক বন্দীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে তাঁকে ‘হে মুহাম্মদ, হে মুহাম্মদ’ বলে ডাক দিল। তিনি এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী সমস্যা তোমার।’ সে বলল, ‘আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে খাবার দিন। আমি তৃষ্ণার্ত, আমাকে পানি দিন।’ তখন নবী (সা.) নিজেই তার এসব প্রয়োজন পূরণ করলেন। (মুসলিম: ১২৬৩)

» কারাগারে চিকিৎসা করা সম্ভব না হলে কারাগার কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং প্রহরায় বাইরে চিকিৎসা করা যাবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা যেমন ধর্তব্য হবে, মানসিক অসুস্থতাও ধর্তব্য হবে। তবে অসুস্থতার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে বাইরে কোনো হাসপাতালে অবস্থান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। 

তথ্যসূত্র: আহকামুস সিজ্নি ওয়া মুআমালাতুস সুজানা ফিল ইসলাম, পৃ. ৩৬৭-৩৭৯।
২. আল মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ: ১৬ / ৩২০-৩২৭। 
৩. ইসলামকিউএ ডট ইনফো, ফতোয়া: ৫১৫৭।

সালাতুত তাসবিহ নামাজের নিয়ম ও ফজিলত

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২১ জানুয়ারি ২০২৬

দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ দূর করার দোয়া

হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল: অর্থ, ফজিলত ও আমলের নিয়ম

সুরা ওয়াকিয়ার বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও আমল করার ফজিলত

কালিমা শাহাদাত: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২০ জানুয়ারি ২০২৬

পবিত্র শবে বরাত ৩ ফেব্রুয়ারি

সুরা ফালাকের বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, ব্যাখ্যা ও ফজিলত

কালিমা তাইয়্যেবার বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত