কোরবানি মহান আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও ত্যাগের এক অনন্য পরীক্ষা। ইসলামের ইতিহাসে এই ইবাদতের মূলে রয়েছে পিতা ও পুত্রের এক বিস্ময়কর আত্মসমর্পণের গল্প, যা আজও মুমিন হৃদয়ে খোদাভীতির সঞ্চার করে।
হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু—আপন পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার আদেশ পেলেন। যেহেতু নবীদের স্বপ্নও একপ্রকার ওহি (ঐশী বার্তা), তাই তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই মহান আল্লাহর এই নির্দেশ পালনে প্রস্তুত হলেন।
পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে যখন তিনি আল্লাহর আদেশের কথা জানালেন, তখন সেই কিশোর পুত্রও বিনা প্রশ্নে সম্মতি দিয়ে বললেন, ‘হে পিতা, আপনি আপনার আদিষ্ট কাজ সম্পন্ন করুন।’ যখন পিতা তাঁর পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিয়ে গলায় ছুরি চালাতে উদ্যত হলেন, ঠিক তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত নাজিল হলো। হজরত জিবরাইল (আ.) জান্নাত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে এলেন এবং ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে সেটি কোরবানি হলো। হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
এই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে কিয়ামত পর্যন্ত অম্লান রাখতে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর কোরবানিকে আবশ্যক করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতএব, তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার: ২)
সাহাবিরা যখন নবী করিম (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন, ‘কোরবানি কী এবং কেন আমরা এটি করব?’ উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’
হজরত মিখনাফ বিন সুলাইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকালে বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল, প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর একটি কোরবানি ও একটি “আতিরা” রয়েছে। তোমরা কি জানো আতিরা কী? তা হলো—যাকে তোমরা “রাজাবিয়া” বলো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৫)
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কেবল উৎসব বা ভোজন নয়, বরং এর মূল চেতনা হলো হৃদয়ের পবিত্রতা ও আল্লাহর ভয়। আল্লাহ তাআলা বাহ্যিক পশুর রক্ত বা মাংস গ্রহণ করেন না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘আল্লাহর নিকট সেগুলোর মাংস ও রক্ত পৌঁছায় না। কিন্তু তাঁর নিকট পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি)।’ (সুরা হজ: ৩৭)
জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এই কোরবানির তাৎপর্য কী?’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এতে আমাদের জন্য কী উপকারিতা রয়েছে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পশমের বদলেও কি নেকি পাওয়া যাবে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৭; মুসনাদে আহমাদ: ১৯৩০২)
আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন (পশু জবাই করে) আদমসন্তান রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় আর কোনো আমল করে না। কিয়ামতের দিন জবাই করা পশু তার শিং, পশম, খুরসহ হাজির হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে তা কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা কোরবানির মাধ্যমে নিজেকে প্রফুল্ল করো; অর্থাৎ প্রফুল্ল মনে কোরবানি করো।’ (জামে তিরমিজি: ১৪৯৩)
ইবরাহিম (আ.)-এর কোরবানি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হওয়া যাবে না। এই ইবাদত আমাদের মনে একনিষ্ঠতা, ধৈর্য ও আত্মসমর্পণের চেতনা জাগিয়ে তোলে।
আমাদের কোরবানি যেন কেবল সামাজিক প্রথা না হয়ে মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের নিদর্শন হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়তে ও তাকওয়ার সঙ্গে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।