কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের কেন্দ্র, তাওহিদের প্রতীক এবং পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ঘর। এই ঘরকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, বহুবারের পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে কাবাঘরের উল্লেখযোগ্য ১০টি পুনর্নির্মাণ পর্ব হলো—
আদম (আ.)-এর মাধ্যমে প্রথম নির্মাণ
কাবা শরিফ প্রথম নির্মিত হয় হজরত আদম (আ.)-এর হাতে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে পৃথিবীতে প্রেরণ করার পর একটি ইবাদতের কেন্দ্র নির্ধারণ করেন, যেখানে তিনি আল্লাহর ইবাদত করবেন। সেই নির্দেশনার ভিত্তিতেই কাবার ভিত্তি স্থাপন করা হয়। তবে কোনো কোনো আলেমের মতে, ফেরেশতারা এরও আগে এখানে তাওয়াফ করতেন, আর আদম (আ.) সেই পূর্ববর্তী ভিত্তির ওপর ঘর নির্মাণ করেন। এই নির্মাণ ছিল খুবই স্বাভাবিক ও প্রাথমিক ধরনের। পাথর দিয়ে তৈরি হলেও এর আকার-আকৃতি বর্তমান কাবার মতো ছিল না। (তফসিরে ইবনে কাসির: ২ / ৬৪)
হজরত শিস (আ.)-এর সংস্কার
হজরত আদম (আ.)-এর পর এবং হজরত নুহ (আ.)-এর সময় মহাপ্লাবনের আগে, হজরত শিস (আ.) আল্লাহর আদেশে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করেছিলেন। আদম (আ.)-এর নির্মাণকাজের বহু বছর পর এবং নুহ (আ.)-এর সময়কার মহাপ্লাবনের অনেক আগে এই সংস্কারকাজ হয়েছিল। (তারিখে দিমাশক লি ইবনি আসাকির: ৭ / ৪২৭)
ইবরাহিম (আ.)-এর পুনর্নির্মাণ
সময়ের প্রবাহে, বিশেষ করে হজরত নুহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনে এই নির্মাণ বিলীন হয়ে যায় বলে অনেক ঐতিহাসিক মত রয়েছে। তবে এর অবস্থান অক্ষুণ্ন ছিল এবং পরে আল্লাহর নির্দেশে আবার সেই স্থানেই কাবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। এই পুনর্নির্মাণ ঘটে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর হাতে। তাঁরা নিজের হাতে পাথর বহন করে এই ঘর তৈরি করেন। ইসমাইল (আ.) পাথর এনে দিতেন এবং ইবরাহিম (আ.) তা বসাতেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তারা দোয়া করেছিলেন—হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দোয়া কবুল করো। নিশ্চয়ই তুমি সবকিছু শোনো এবং জানো।’ (সুরা বাকারা: ১২৭)
এই নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘মাকামে ইবরাহিম’, যেখানে দাঁড়িয়ে ইবরাহিম (আ.) কাজ করতেন। এই পুনর্নির্মাণই বর্তমান কাবার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমালেকা গোত্রের সংস্কার
ইবরাহিম (আ.)-এর পর কাবার দায়িত্ব বিভিন্ন গোত্রের হাতে আসে। তার মধ্যে অন্যতম একটি গোত্র ছিল আমালেকা। তারা কাবার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সংস্কার করে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত, তবু অনেক সিরাত ও ইতিহাস গ্রন্থে তাদের অবদানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সে সময়ের কাবা ছিল কেবল ধর্মীয় কেন্দ্র। তাওহিদের বিশুদ্ধতা অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হতে শুরু করেছিল। বিভিন্ন গোত্রের নিজেদের মতো করে ইবাদতের রীতি চালু করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে শিরকের প্রভাবও প্রবেশ করতে থাকে। আমালেকা গোত্রের সংস্কার মূলত কাঠামোগত ছিল, তারা ভেঙে পড়া অংশ মেরামত করে এবং কাবাকে ব্যবহারযোগ্য রাখে। (তাখরিজুল মহল্লি: ২ /৫)
জুরহুম গোত্রের পুনর্নির্মাণ
জুরহুম গোত্র ছিল হজরত ইসমাইল (আ.)-এর শ্বশুরগোষ্ঠী। তারা দীর্ঘদিন মক্কা ও কাবার তত্ত্বাবধায়ক ছিল এবং কাবার সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ছিল। তাদের সময়ে কাবার চারপাশে বসতি গড়ে ওঠে এবং মক্কা একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আমালেকা সম্প্রদায়ের বানানো কাবা ভেঙে গেলে তারা এটাকে পুনর্নির্মাণ করেন। ((তাখরিজুল মহল্লি: ২ /৫)
কুসাই ইবনে কিলাবের সংস্কার
কুসাই ইবনে কিলাব ছিলেন নবীজি (সা.)-এর পূর্বপুরুষ এবং কুরাইশদের প্রভাবশালী নেতা। তিনি মক্কার প্রশাসন পুনর্গঠন করেন। তাঁর সময়ে কাবার চারপাশে ঘরবাড়ি নির্মিত হয় এবং মক্কা একটি সুসংগঠিত শহরে পরিণত হয়। তিনি ‘দারুন নদওয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। কুসাই কাবার সংস্কার করেন, যা তখন ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থায় ছিল। (দালায়িলুন নবুওয়াহ লিল বাইহাকি: ২ / ৪৪)
কুরাইশদের পুনর্নির্মাণ
বন্যার কারণে কাবার দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের আগে কুরাইশরা কাবা পুনর্নির্মাণ করে। তারা হালাল উপার্জনের অর্থ দিয়ে এই নির্মাণকাজ শুরু করে। এই পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে, নবীজি (সা.) একটি চাদরের ওপর পাথরটি রেখে সব গোত্রপ্রধানকে তা বহন করতে বলেন এবং নিজের হাতে তা স্থাপন করেন। এতে বিরোধ মিটে যায়। (তাখরিজুল মহল্লি: ২ /৫)
আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর পুনর্নির্মাণ
৬৪ হিজরিতে ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর আক্রমণে কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) তা পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিসের ভিত্তিতে কাবাকে ইবরাহিমি ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করেন। তাঁর এই নির্মাণ ছিল সুন্নাহভিত্তিক এবং অত্যন্ত প্রশংসিত। এটি কাবাকে তার মূল রূপে ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা ছিল। (জামে তিরমিজি: ৮৭৫)
হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের পুনর্নির্মাণ
উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর নির্মাণ ভেঙে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আবার কুরাইশদের নকশায় কাবা পুনর্নির্মাণ করেন। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল ছিল। পরে খলিফারা এটি আবার পরিবর্তন করার কথা ভাবলেও ফিতনার আশঙ্কায় তা করেননি। (জামে তিরমিজি: ৮৭৫)
সুলতান মুরাদের (চতুর্থ) পুনর্নির্মাণ
১০৪০ হিজরিতে বন্যায় কাবা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে উসমানীয় সুলতান চতুর্থ মুরাদ এটি পুনর্নির্মাণ করেন। বর্তমান কাবার কাঠামো মূলত ওই সময়কার। তিনি অত্যন্ত মজবুতভাবে কাবা নির্মাণ করেন এবং উন্নত স্থাপত্য ব্যবহার করেন। এই নির্মাণ আজও টিকে আছে।