একটি সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন দুজন মানুষ—স্বামী ও স্ত্রী। একই ছাদের নিচে আলাদা চিন্তা ও অভ্যাসের দুজন মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহনশীলতার মাধ্যমে গড়ে তোলেন একটি নতুন জীবন। সুখী সংসার এক দিনে গড়ে ওঠে না; তা সময়ের পরতে পরতে নির্মিত হয়। সংসারের এই হাসি ইহকাল পেরিয়ে পরকালেও অক্ষুণ্ন থাকে—যদি দাম্পত্য জীবন আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী সাজানো হয়। পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি সুখী, শান্তিময় ও বরকতময় সংসার গড়ে তোলার পাঁচটি মৌলিক ভিত্তি নিচে আলোচনা করা হলো:
সুখী সংসারের প্রথম ধাপ হলো, সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন। প্রচলিত আছে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।’ একজন নেককার ও চরিত্রবান স্ত্রী পুরো পরিবারকে শান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারেন। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে দ্বীনদারি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়—তার সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারি। অতএব, তুমি দ্বীনদার নারীকে প্রাধান্য দাও; তাহলে তুমি সফল হবে।’ (সহিহ বুখারি)
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা দাম্পত্যের অন্যতম শর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা বাকারা: ১৮৭)। পোশাক যেমন দেহের ত্রুটি আড়াল করে সৌন্দর্য বাড়ায়, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব হলো পরস্পরের দোষত্রুটি গোপন রেখে একে অপরের মর্যাদা রক্ষা করা। জনসমক্ষে একে অপরকে হেয় করা মুমিনের চরিত্র নয়; বরং ভুল হলে প্রজ্ঞার সঙ্গে তা সংশোধন করাই আদর্শ দম্পতির কাজ।
একজন সতী ও ধর্মপরায়ণ নারী স্বামীর হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেন এবং সন্তানদের উত্তম আদর্শে গড়ে তোলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম: ২১)। যে সংসারে নেককার স্ত্রী এই গুণের বিকাশ ঘটান, তা আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতে পরিণত হয়।
ইসলাম স্বামীকে পরিবারের চালিকাশক্তি ও অভিভাবক নির্ধারণ করেছে। এই নেতৃত্ব কোনো স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব নয়, বরং তা সুরক্ষা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক; কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা নিসা: ৩৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের নির্দেশ দিয়েছেন স্ত্রীদের উত্তম খাবার, পোশাক নিশ্চিত করতে এবং তাদের সঙ্গে কখনো রূঢ় আচরণ না করতে।
দাম্পত্য জীবনের প্রাণ হলো ভালোবাসা ও কোমলতা। এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন এবং সর্বদা হাসিমুখে সময় কাটাতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি)
সুখী সংসার কেবল আর্থিক সচ্ছলতা বা বাহ্যিক আভিজাত্যের নাম নয়; এর আসল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি, পারস্পরিক ত্যাগ ও ক্ষমাশীলতা। পৃথিবীতে কোনো মানুষই নিখুঁত নয়। তাই ত্রুটিহীন মানুষ খোঁজার চেয়ে একে অপরকে বুঝে নেওয়ার মানসিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখার মাধ্যমেই একটি সংসার পৃথিবীতেই জান্নাতের নীড়ে পরিণত হতে পারে।
লেখক: উস্তাযুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা।