হোম > ইসলাম

তাহাজ্জুদ নামাজ: দোয়া কবুল ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

ইসলাম ডেস্ক

মসজিদে নামাজ আদায় করছেন একজন মুসল্লি। ছবি: সংগৃহীত

দিনের ব্যস্ততায় আমরা অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা করি, নানা দায়িত্ব পালন করি, অসংখ্য কথোপকথনে নিজেকে জড়িয়ে রাখি। কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা সবার জন্য নয়—শুধু আপনজনদের জন্য। গভীর রাতের নীরবতা ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত।

অনেকে চমৎকার একটি উপমা ব্যবহার করেন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যেন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় আর তাহাজ্জুদ হলো সেই নিভৃত মুহূর্ত, যখন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; থাকে শুধু ভালোবাসা, অশ্রু, আত্মসমর্পণ আর বান্দা-রবের একান্ত কথোপকথন। যদিও এটি সরাসরি কোরআন বা হাদিসের শব্দ, রূপক নয়, তবু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক মহান সত্য—যে বান্দা স্বেচ্ছায় আরামের ঘুম ত্যাগ করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, সে রবের বিশেষ নৈকট্য অর্জন করে।

যখন পৃথিবী ঘুমায়, তখন জেগে থাকে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা

রাতের শেষ প্রহর—চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। নেই মানুষের কোলাহল, নেই দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততা। এই সময় একজন মুমিন যখন অজু করে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে, তখন সে পৃথিবীর সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে শুধু তার রবের সঙ্গে কথা বলে।

এ সময়ের ইবাদত লোকদেখানোর নয়, মানুষের প্রশংসা পাওয়ারও নয়; এটি এমন এক ইবাদত, যার একমাত্র সাক্ষী স্বয়ং আল্লাহ তাআলা।

কোরআনের আলোয় তাহাজ্জুদ নামাজের মর্যাদা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাতের এই বিশেষ ইবাদতের প্রশংসা করে ইরশাদ করেছেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা ইসরা: ৭৯)

অন্য জায়গায় নেককার বান্দাদের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা রাতের খুব অল্প সময়ই ঘুমাত এবং শেষ রাতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা জারিয়াত: ১৭–১৮)

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাতের এই গোপন ইবাদত ছিল আল্লাহর প্রিয় ও নেক বান্দাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর বিশেষ আহ্বান ও দোয়া কবুল

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের রব দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হন এবং বলতে থাকেন—কে আছো, যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো, যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে তা দান করব? কে আছো, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ (সহিহ বুখারি: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮)

এটি এমন এক পরম সৌভাগ্যের ঘোষণা, যা প্রত্যেক ইমানদারের হৃদয়কে নাড়া দেয়। পৃথিবীর কোনো অধিপতি তার প্রজাদের এভাবে ডেকে বলে না—‘এসো, তোমার যা প্রয়োজন চেয়ে নাও।’ অথচ সমগ্র জাহানের সৃষ্টিকর্তা নিজেই তাঁর বান্দাদের ডেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেন।

তাহাজ্জুদ: ভালোবাসার সবচেয়ে নিভৃত ভাষা

ভালোবাসার একটি বড় লক্ষণ হলো—প্রিয় সত্তার জন্য স্বেচ্ছায় কষ্ট সহ্য করা। কনকনে শীতের রাতে বা সারা দিনের ক্লান্তি শেষে উষ্ণ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো সহজ কথা নয়। কিন্তু যে হৃদয়ে আল্লাহর সুগভীর ভালোবাসা জাগ্রত হয়, তার কাছে এই সামান্য কষ্টই হয়ে ওঠে দুনিয়ার সবচেয়ে মধুর ও আনন্দদায়ক ইবাদত।

তাহাজ্জুদ আমাদের শেখায়—আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে উচ্চ শব্দ বা কোলাহল নয়, একটি বিনীত ও বিনম্র হৃদয়ই যথেষ্ট।

কেন প্রতিদিনের জীবনে তাহাজ্জুদ রাখা উচিত

নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করার মাধ্যমে একজন মুমিন আত্মিক ও মানসিকভাবে দারুণভাবে সমৃদ্ধ হয়:

  1. আল্লাহর নৈকট্য: অন্তরকে মহান আল্লাহর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে।
  2. গুনাহ থেকে সুরক্ষা: আত্মাকে পাপাচার ও কুমন্ত্রণা থেকে দূরে রাখার আত্মিক শক্তি জোগায়।
  3. দোয়া কবুল: জীবনের যেকোনো সংকট নিরসনে দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময় এটি।
  4. অন্তর প্রশান্তি: দুশ্চিন্তা দূর করে হৃদয়ে এক ঐশ্বরিক প্রশান্তি ও আলো ছড়িয়ে দেয়।
  5. ইমানি মজবুতি: ইমানকে জীবন্ত রাখে এবং দ্রুত আত্মশুদ্ধির পথ সুগম করে।

যে ব্যক্তি রাতের অন্ধকারে একান্তে আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমন আলোয় ভরিয়ে দেন, যা পৃথিবীর কোনো বাহ্যিক আলো দিতে পারে না।

ছোট শুরুই হতে পারে আত্মিক পরিবর্তনের সূচনা

অনেকেই মনে করেন, তাহাজ্জুদ পড়া মানেই হয়তো সারা রাত জেগে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ পড়তে হবে। বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।

আপনি চাইলে খুব ছোট পদক্ষেপে শুরু করতে পারেন:

  1. ধীরে ধীরে অভ্যাস করা: শুরুতে সপ্তাহে অন্তত এক বা দুই দিন তাহাজ্জুদের নিয়ত করুন।
  2. সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিবিড় নামাজ: মাত্র দুই রাকাত দিয়ে শুরু করুন।
  3. একান্তে রবের কাছে কান্নাকাটি: নামাজের পর কয়েক মিনিট মন খুলে নিজের ভাষায় রবের কাছে আকুতি জানান।

আল্লাহ তাআলা পরিমাণের চেয়ে ইবাদতের ধারাবাহিকতা ও নিষ্ঠাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়—যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪, সহিহ মুসলিম: ৭৮২)

মনে রাখবেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য ফরজ ইবাদত—এটি কখনোই অবহেলা করার সুযোগ নেই। আর তাহাজ্জুদ হলো সেই বিশেষ নফল ইবাদত, যা বান্দাকে আল্লাহর ভালোবাসার অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

স্বপ্নদোষ হলে কি কোনো গুনাহ হয়

স্বপ্নে বিভিন্ন প্রাণীর ডাক শোনার ব্যাখ্যা কী, ইসলাম কী বলে

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২১ জুলাই ২০২৬

যে সুরা পাঠ না করলে নামাজ হয় না

আজকের নামাজের সময়সূচি: ২০ জুলাই ২০২৬

যে ১০ শ্রেণির মানুষকে অভিশাপ দিয়েছেন নবী (সা.)

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৯ জুলাই ২০২৬

দোয়া ইউনুসের ৫ ফজিলত

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১৮ জুলাই ২০২৬

জুমার দিন আগেভাগে মসজিদে যাওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত