সুরা কাউসারের আরবি ও বাংলা উচ্চারণ
সুরা কাউসার
আরবি
বাংলা উচ্চারণ
অর্থ
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
১. ইন্না-আতাইনা কাল কাউসার।
নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
২. ফাসাল্লি লিরাব্বিকা ওয়ানহার।
কাজেই আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
৩. ইন্না শা-নিআকা হুওয়াল আবতার।
নিশ্চয় আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই (নাম-নিশানাবিহীন) নির্বংশ।
সুরা কাউসারের শানে নুজুল (নাজিলের পটভূমি)-
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্রসন্তান ইবরাহিম (রা.) শৈশবে মারা গেলে কাফিররা (বিশেষ করে আস ইবনে ওয়ায়েল) নবীজি (সা.)-কে বিদ্রূপ করে ‘আবতার’ বা ‘বংশহীন’ বলে গালি দিত। তাদের ধারণা ছিল, নবীজির মৃত্যুর পর তাঁর নাম নেওয়ার মতো আর কেউ থাকবে না। কাফিরদের এই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের জবাবে আল্লাহ তাআলা সুরা কাউসার নাজিল করেন এবং ঘোষণা করেন যে নবীজি নির্বংশ নন, বরং তাঁর শত্রুরাই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে।
সুরা কাউসারের শব্দগত বিশ্লেষণ-
- কাউসার: এর শাব্দিক অর্থ অগণিত কল্যাণ বা অবারিত বরকত। সহিহ্ মুসলিমের (হাদিস: ৬০০২) বর্ণনা অনুযায়ী, ‘কাউসার’ হলো জান্নাতের একটি বিশেষ নদী, যার পানি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়েও মিষ্টি।
- ওয়ানহার: এর অর্থ ‘কোরবানি করো’। এটি নির্দেশ দেয়, যেকোনো ইবাদত ও ত্যাগ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হতে হবে।
- আবতার: এর অর্থ লেজকাটা বা নির্বংশ। আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, রাসুল (সা.)-এর নাম কিয়ামত পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান থাকবে, আর তাঁর শত্রুরাই হবে লাঞ্ছিত ও বিস্মৃত।
সুরা কাউসারের সহজ তাফসির-
- প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি তাঁর দেওয়া নেয়ামতের ঘোষণা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে কাউসার দান করেছি।’ সহিহ্ হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কাউসার একটি ঝরনা, যা বেহেশতে মহানবী (সা.)-কে দান করা হবে।’ কোনো কোনো হাদিসে কাউসার বলতে ‘হাউস’ বোঝানো হয়েছে। যে হাউস থেকে ইমানদারেরা জান্নাতে যাওয়ার আগে নবীজির পবিত্র হাতে পানি পান করবেন। অনেকে বলেছেন, কাউসার অর্থ প্রভূতকল্যাণ। এতে এই আয়াতের মর্মে মহানবী (সা.)-কে দান করা আল্লাহর সব নিয়ামত অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। (ইবনে কাসির)
- দ্বিতীয় আয়াতে সেই নিয়ামতের শোকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমার পালনকর্তার জন্য নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া এসব নিয়ামতের বিনিময়ে নামাজ ও কোরবানির মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। কোরবানি বলতে এখানে জিলহজ মাসে পবিত্র ঈদুল আজহার সময় যে পশু কোরবানি দেওয়া হয়, তাকেই বোঝানো হয়েছে।
- তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের অভিশাপ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী নির্বংশ।’ নবীজির কোনো ছেলেসন্তান জীবিত না থাকায় অনেক কাফির তাঁকে নির্বংশ বলে ঠাট্টা করেছিল। তাদের উচিত জবাব দিতেই মহান আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের অবতারণা করেন। বলেন, নবীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীরাই বরং ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তাদের কথা মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণ করবে।
মুমিনের জীবনে সুরা কাউসারের শিক্ষা-
ব্যস্ত ও সংকটময় জীবনে সুরা কাউসার আমাদের তিনটি বিশেষ শিক্ষা দেয়:
- হতাশ না হওয়া: আল্লাহর দান ও রহমত সীমাহীন, তাই কোনো হারানো বা শোকে মুমিনের নিরাশ হওয়া সাজে না।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: নিয়ামত পেলে কেবল মুখে নয়, বরং নামাজ ও কোরবানির (ত্যাগের) মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়।
- সত্যের জয়: সত্যের পথে চললে নিন্দুক বা শত্রুরা সাময়িকভাবে শক্তিশালী মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
সুরা কাউসার মূলত মুমিনের জন্য এক পরম আশ্বাসের বাণী। এটি আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি অবস্থায় একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে এবং সব নিয়ামতের জন্য তাঁরই ইবাদতে মগ্ন থাকতে।