করপোরেট কমিউনিকেশন, মিডিয়া রিলেশন এবং ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এক যুগের বেশি সময়ের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে তানভীর আহমেদ কাজ করছেন আন্তর্জাতিক পরিসরে। বর্তমানে তিনি বিশ্বখ্যাত চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মার্কেটিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বৈশ্বিক করপোরেট যোগাযোগের নানামুখী দিক, আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিক মোস্তাফিজ মিঠু।
পাবলিক রিলেশনসকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
অনেকেই পিআরকে শুধু প্রচার বা মিডিয়া কাভারেজের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ভাবেন। বাস্তবে পিআর হলো একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও উন্নত ভাবমূর্তি তৈরি এবং ধরে রাখার কৌশল। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার প্রতি গ্রাহক এবং সহযোগীদের আস্থা বাড়ে। একই সাথে দেশ এবং দেশের মানুষের সাথে সুন্দর বিশ্বাসের যোগসূত্র তৈরি হয়। সব মিলিয়ে মানুষ সেই প্রতিষ্ঠানকে ভাল হিসেবে চিনে। এখানে গণমাধ্যম, সংশ্লিষ্ট ইন্সটিটিউশন, সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটি, এক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে যে কারও সাথেই কাজ করতে হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় যোগাযোগ, এবং কৌশলগত চিন্তা ও মানবিক সম্পর্ক—এ তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করে।
এ পেশায় আসার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল?
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই গণমাধ্যমে কাজ করার আগ্রহ ছিল। সে সময় টেলিভিশন মিডিয়ার দ্রুত বিস্তার এবং সাংবাদিকদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। আমি এমন একটি ক্যারিয়ার চেয়েছিলাম, যেখানে একঘেয়েমি থাকবে না এবং প্রতিদিন নতুন মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ থাকবে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা পারিবারিক অসম্মতি সত্ত্বেও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হই। এবং পরবর্তীতে এই সেক্টরেই কাজ শুরু করি।
করপোরেট কমিউনিকেশনে আপনার যাত্রা কীভাবে শুরু হয়?
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন যখন সাংবাদিকতা করছি তখন আমার ঝোঁক তৈরি হয় পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে কোন একটি কর্পোরেট অফিসে কাজ করার। ২০০৫-০৬ সালের দিকে কর্পোরেট বলতে গ্রামীণফোন ছিল লোভনীয়। ২০০৭ সালে যখন গ্রামীণফোন প্রথম স্টুডেন্ট রিক্রুট করছিল তাঁদের কল সেন্টারের জন্য তখন সেখানে জয়েন করি। এরপর সেখানে পার্মানেন্ট হিসেবে কর্পোরেট সেলসেও কাজ করি প্রায় দুই বছর। খুব ভালই পারফর্ম করছিলাম। কিন্তু মনে ছিল সেই পাবলিক রিলেশন টিমে কাজ করার ইচ্ছা। ২০১৩ সালে করপোরেট কমিউনিকেশন বিভাগে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমার পছন্দের পেশাগত যাত্রা শুরু হয়।
একটা কথা বলতেই হয়-ছাত্রাবস্থায় গ্রামীণফোনের কল সেন্টারে কাজ করা কিংবা সেলসে বিভিন্ন মানুষের সাথে মেশার যে অভিজ্ঞতা তা আমার যোগাযোগ দক্ষতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সমস্যা বোঝা এবং সমাধান দেওয়া—এই অভিজ্ঞতা পরে পিআর পেশায় অনেক কাজে এসেছে।
স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা পিআরে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
পিআরের কাজ অনেক বিস্তৃত। এখানে একই সাথে কর্পোরেট রেপুটেশন, ব্রান্ডিং, প্রোডাক্ট মার্কেটিং, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সব। প্রাতিষ্ঠানিক যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তার ওপর ভিত্তি করে একটা বাৎসরিক কর্ম পরিকল্পনা অবশ্যই থাকা দরকার। একই সাথে কোন বার্তা কার জন্য দরকার, তার কাছে কীভাবে সেই বার্তা পৌঁছাবে, সেই বার্তায় কী কী বলা হবে সেগুলোও প্রতিটা ক্ষেত্রে আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হয়। ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ বজায় রাখতে পলিসিগত বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করতে হয় পাবলিক রিলেশন এক্সপার্টদের। সেই ক্ষেত্রেও একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার।
কমিউনিকেশনের সফলতা মূল্যায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত মূল্যায়ন ছাড়া পিআর কার্যক্রম কার্যকর হয় না। কোন বার্তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, কোথায় উন্নতির সুযোগ আছে—এসব বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পরিকল্পনা করতে হয়।
বাংলাদেশে পিআর পেশার বর্তমান অবস্থা কীভাবে দেখছেন?
বাংলাদেশে পিআর সেক্টর দ্রুত এগোচ্ছে। আগে করপোরেট হাউসগুলোতে পিআর মূলত মার্কেটিং বিভাগের অংশ ছিল। এখন আলাদা পিআর ও কমিউনিকেশন বিভাগ গড়ে উঠছে। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পারছে, কমিউনিকেশন কন্টেন্টের পরিপক্কতা, এর নিগূঢ়তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এটা দীর্ঘস্থায়ী এবং এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
সাংবাদিকতা থেকে পিআরে আসতে আগ্রহীদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
ভাষা দক্ষতা এবং করপোরেট কালচার ও মানসিকতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। করপোরেট পরিবেশে ইংরেজি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ, তাই বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই দক্ষতা দরকার। এ ছাড়া ইগো এবং সময় ব্যবস্থাপনাও জরুরি। এখানে সকলের সাথে সমানভাবে সম্পর্ক রক্ষা করাটাই বড় দক্ষতা। যে কোন বিষয়কে একই সাথে ম্যাক্রো এবং হোলিস্টিক ভিউ থেকে দেখে ৩৬০ ডিগ্রী পরিকল্পনা করাটা গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে পিআরের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট পিআর ক্যারিয়ারের অন্যতম দিক। মূলত যে কোন ক্রাইসিসই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবচেয়ে ক্ষতি করে। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট পিআরও-দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। এখানেও সেই পুরাতন কথা প্রযোজ্য- ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’। সময়মতো সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে সংকট আগেই অনুমান করা সম্ভব। স্টেকহোল্ডারদের সাথে সম্পর্ক গভীর থাকলে এই বিষয়গুলো আগে থেকেই আঁচ পাওয়া যায় এবং সেই হিসাবে খুব বিচক্ষণতার সাথে পদক্ষেপ নিতে হয়। এরপরেও যদি ক্রাইসিস তৈরি হয়েই যায়, তাহলে খুব দ্রুত অভ্যন্তরীন ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম গঠন, হোল্ডিং স্টেটমেন্ট তৈরি, রিজয়েন্ডার পাঠানো, ক্রাইসিসের সঠিকতা যাচাই ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়া ছাড়াও মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। এই সময় ঘাবড়ে না গিয়ে ভাল বিষয়গুলো বেশি বেশি তুলে আনা দরকার।
ডিজিটাল মিডিয়া পিআরের কাজকে কীভাবে বদলে দিয়েছে?
ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া পিআরের কাজকে আরও গতিশীল করেছে। ফেসবুক ও লিংকডইনের মতো প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট টার্গেট গ্রুপে পৌঁছাতে সহায়ক। মিডিয়া হাউজ গুলোও এখন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম নিয়ে বেশ সরব। পাঠক বা ভিউয়ারও সেগুলতেই বেশি। কন্টেন্টের স্টাইল পরিবর্তন হয়েছে অনেক। তবে বড় সামাজিক প্রভাব ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় মূলধারার মিডিয়ার গুরুত্ব এখনো অপরিহার্য।
তরুণদের জন্য আপনার ক্যারিয়ার পরামর্শ কী?
পিআর পেশায় আসতে হলে সততা, ধৈর্য এবং যে কোন কাজে ভ্যালু এডিশন সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লাগে; কিন্তু নষ্ট হতে এক মুহূর্ত। মানুষের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলেই এ পেশায় দীর্ঘমেয়াদি সফলতা সম্ভব।