ইরানের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির মোহাম্মদ আক্রমিনিয়া গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধের এক নতুন পর্যায় প্রত্যক্ষ করছি।’ তাঁর এই মন্তব্যকে ভুল বলার সুযোগ নেই। ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বোমা হামলা চালিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা বাব এল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের যে হুমকি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করেছে।
ইয়েমেনভিত্তিক ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী আরও দাবি করেছে, সৌদি আরবের আরও ১০টি তেলবাহী ট্যাংকারকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে তারা সৌদি আরবের ভূখণ্ডেও বোমা হামলা চালাতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছে। সৌদি আরব হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধ এড়াতে দেশের বিপরীত উপকূলে অবস্থিত বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে রপ্তানি করা হচ্ছিল।
ফলে লোহিত সাগরে এই নতুন যুদ্ধফ্রন্ট খুলে দিয়ে ইরান কার্যত বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার লড়াইয়ের সূচনাও করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে এই নতুন চাপ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে এক সংকটসীমার আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে। সেই সীমা অতিক্রম করলে বিশ্বকে অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর সরবরাহ-সংকট এবং লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এখন পর্যন্ত এই সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে। কারণ, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মজুত তেল আক্রমণাত্মকভাবে বাজারে ছাড়ছে, যা বাজারের ওপর চাপ কমাচ্ছে। কিন্তু বেইজিংয়ের মজুতে আর কত তেল অবশিষ্ট রয়েছে, তা কেউ জানে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
মার্চ মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। আরও প্রায় একই পরিমাণ তেল তারা ছাড়তে পারবে। এর বেশি ছাড়তে গেলে সংরক্ষণ ট্যাংক ও পাইপলাইনের ক্ষতির ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যাবে। চলতি মাসের শুরুতে ওই রিজার্ভে প্রায় ৩১ কোটি ৯৫ লাখ ব্যারেল তেল অবশিষ্ট ছিল।
অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী। এটি এখন প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের সীমা পেরে গেছে। এই মূল্যসীমায় পৌঁছালেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত ট্রুথ সোশ্যালে লিখে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি খুবই সন্নিকটে। তবে এবার তিনি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ইরান আলোচনার টেবিলে না আসা পর্যন্ত তিনি দেশটিতে বোমা হামলা চালিয়ে যাবেন।
তাঁর সর্বশেষ হুমকি হলো, ইরান বা তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো যে প্রতিটি ট্যাংকারে হামলা চালাবে, তার জবাবে ইরানের একটি সেতু অথবা একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যে জেনেভা কনভেনশনের বিধান যেন আর কার্যকর নেই।
তেলবাজার বিপজ্জনক সংকটসীমায় পৌঁছানোর আগেই ট্রাম্পের ইরানকে বোমা মেরে নতি স্বীকার করানোর অভিযান সফল হতে হবে। তা না হলে এর অর্থনৈতিক অভিঘাত নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চীনের কথিত নির্বাচনী কারচুপি নিয়ে যতই কথা বলা হোক না কেন, সেই দায় এড়ানো সম্ভব হবে না।
কিন্তু যুদ্ধের ইতিহাস বলছে, শুধু বোমা হামলার মাধ্যমে খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো প্রতিপক্ষকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়। ইরানকে সত্যিকার অর্থে আশাহীন অবস্থায় ঠেলে দিতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং সম্ভবত স্থলবাহিনীরও প্রয়োজন হবে। এটি আরেকটি সময়সীমার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও ক্ষেপণাস্ত্র, দুটোই দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসের কাছে আরও অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানাতে গিয়ে ‘গুরুতর ঘাটতির’ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অথচ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তিনি যে অতিরিক্ত ৬৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছেন, তা অনুমোদন দিতে আইনপ্রণেতারা অনীহা দেখাচ্ছেন।
এদিকে ব্যয় অব্যাহত রয়েছে। এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইতোমধ্যে এই যুদ্ধমঞ্চে যুক্ত হয়েছে। আরও আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাংকার বিমান ইসরায়েলের পথে রয়েছে। পাশাপাশি, অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার জবাব দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গোলাবারুদও দ্রুত কমে যাচ্ছে। এসব অস্ত্র পুনরায় মজুত করতে বহু বছর লেগে যাবে।
অবশ্যই ইরানও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে রয়েছে। তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও দ্রুত কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় অংশ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাহলে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুটিই অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের জীবনযাত্রা আগে থেকেই কঠিন ছিল। বিকল্পের সুযোগও খুব সীমিত, ভিন্নমত প্রকাশের পরিসরও সামান্য। তাই ধরে নেওয়া নিরাপদ যে কষ্ট সহ্য করার ক্ষেত্রে ইরানের সীমা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। সময় যত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, ট্রাম্পের সামনে দুটি পথই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে: হয় তাঁকে পিছু হটতে হবে, নয়তো আরও বড় মাত্রায় যুদ্ধ জোরদার করতে হবে। ইরানিদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা যেন তাঁকে একটি স্থলযুদ্ধে টেনে আনতেই আশাবাদী।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আক্রমিনিয়া বলেন, ‘স্থল অভিযান শত্রুর ওপর আরও বড় ক্ষতি ও অধিক হতাহতের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই ক্ষেত্রে আমাদের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি হবে।’
বিশ্বের বাকি অংশ এখন আশা করছে, সময়ের সঙ্গে ট্রাম্পের এই দৌড়ের একটি বাস্তবসম্মত প্রস্থানপথ রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ধোঁয়াশার ভেতর সেই পথ খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইউকে