চলতি বছরের শুরুর দিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ১০০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার শুল্ক ফেরত দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন কাস্টমস কর্মকর্তারা ইউএস কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের বিচারকদের জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক থেকে সংগৃহীত ১৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ফেব্রুয়ারিতে জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যাপক শুল্ক আরোপের পথ বন্ধ করে দেওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকেরা ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনকে (সিবিপি) এসব অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন। এই রায় প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ব্যাপক ব্যবহারের ওপর উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
এত দ্রুতগতিতে শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনা ট্রাম্পের অস্থির বাণিজ্যযুদ্ধের সর্বশেষ নাটকীয় মোড়। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাম্প নজিরবিহীন মাত্রায় শুল্ক ব্যবহার করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর মার্কিন কর্মকর্তারা এবং ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন, এসব অর্থ ফেরত দেওয়া নির্ভর করবে পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের ওপর। ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, ‘এই মামলা নিষ্পত্তি হতে এবং অর্থ ফেরত দিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। আর যদি অর্থ ফেরত দেওয়াও হয়, তাহলে মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত এটি শুধু করপোরেট কল্যাণে পরিণত হবে।’
গত মাসেও ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, শুল্ক বাতিলের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচারপতিরা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার’ ক্ষতির মুখে ফেলেছেন।
তবে অর্থ ফেরত দেওয়ার যে গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে বাণিজ্য আইনজীবী ও বিশ্লেষকেরা বিস্মিত হয়েছেন। ওয়াশিংটনের সিডলি অস্টিনের বাণিজ্য আইনজীবী টেড মারফি বলেন, ‘প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’
গতকাল মঙ্গলবার আদালতে দাখিল করা নথিতে সিবিপি জানিয়েছে, ১২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ‘প্রক্রিয়াকরণের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে।’ এর অর্থ হলো, আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া সামনে রয়েছে। ক্যাপস্টোন নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের হয়ে আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষক ওয়াকার লিভিংস্টন বলেন, ‘সরকার এত দ্রুত এগোচ্ছে দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আনন্দিতভাবে বিস্মিত হয়েছি।’
তবে মার্কিন আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করছেন, ফেরত দেওয়া অর্থ মূলত বড় বড় কোম্পানির কাছেই যাচ্ছে। যেসব ভোক্তা ও ছোট ব্যবসার ওপর শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত চাপানো হয়েছিল, তাদের কাছে সেই অর্থ খুব কমই ফিরে যাচ্ছে। টেক্সাসের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ কাসার বলেন, ‘ট্রাম্প এই ‘রিফান্ড’ বা ফেরত দেওয়া অর্থ শ্রমজীবী মানুষের কাছে নয়, কোম্পানিগুলোর কাছে পাঠাচ্ছেন। এসব ফেরতের প্রতিটি সেন্টই মার্কিন ভোক্তাদের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত।’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর আদালতের নির্দেশে সিবিপিকে শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটে কেবল ‘আমদানির রেকর্ডে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান’ বা ‘ইমপোর্টার অব রেকর্ড’ হিসেবেই নিবন্ধিত পক্ষগুলো ফেরতের দাবি জানাতে পারে।
এর ফলে এমন ছোট ব্যবসাগুলো বাদ পড়ে যাচ্ছে, যারা নিজেরা সরাসরি পণ্য আমদানি করেনি, কিন্তু বেশি খরচ কিংবা আলাদাভাবে আরোপিত সারচার্জের মাধ্যমে কার্যত সেই শুল্কের অর্থ পরিশোধ করেছে। অন্য কিছু ছোট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, তারা কীভাবে নিজেদের পরিশোধ করা শুল্ক ফেরত পাবে, সে বিষয়েই অবগত নয়। অনেকের আবার সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সক্ষমতাও নেই।
বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আমদানিকারকদের ফেরত দিতে বাধ্য হলেও ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ধারার শুল্ক আরোপের মাধ্যমে আবারও তাঁর ‘ট্যারিফ ওয়াল’ বা শুল্কপ্রাচীর পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে প্রশাসন পৃথক একটি আইনকে নতুন শুল্ক আরোপের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে। এর আওতায় ৬০ টিরও বেশি অর্থনীতির ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
তবে সর্বশেষ এই শুল্কগুলোর বিরুদ্ধেও ইতোমধ্যে অন্তত তিনটি পৃথক আইনি চ্যালেঞ্জ দায়ের হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে এমন মামলাও রয়েছে, যার আইনজীবীরা আগে ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে সফলভাবে আইনি লড়াই করেছিলেন।