মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্তত আপাতত ইরানে সামরিক হামলা ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, যুদ্ধ আরও তীব্র হলে মধ্যপ্রাচ্যে এরমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক (বা এন্টি মিসাইল ইন্টারসেপ্টর) এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা গোলাবারুদের মজুত বিপজ্জনকভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এমন বহু বিবেচ্য বিষয়ের একটি, যার কারণে বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধ আবার শুরু করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা, ইরানি হামলার ঝুঁকিতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্রদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং জ্বালানি ও শরণার্থী সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
ইরান সংঘাত মোকাবিলায় ট্রাম্পের সর্বশেষ অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে শুক্রবার তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর। আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি এ মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকের গোপন আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পেন্টাগনের দ্রুত কমে আসা প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত। গত শুক্রবার জর্ডানে ৩ মার্কিন সেনা নিহত হন, যখন ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপক হামলা প্রতিহত করার সময় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে বলে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান।
কর্মকর্তাদের মতে, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব হলেও এতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) হাতে থাকা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যাবে। সেন্ট্রাল কমান্ড মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের দায়িত্বে রয়েছে। তবে জেনারেল কেইনের একজন মুখপাত্র প্রেসিডেন্টকে দেওয়া তাঁর পরামর্শ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, প্রেসিডেন্ট ‘সব সময়ই বলে এসেছেন যে, তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন, তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাহলে তাঁর সামনে সব ধরনের বিকল্পই খোলা থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ধারাবাহিক হামলার পর ইরানের জন্য আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তির পথে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে; অন্যথায় কী ঘটবে, তা তারা জানে।’
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে, বিশেষ করে কীভাবে আবার হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা যায়, তা নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ভাবছেন। গত দুই সপ্তাহে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ায় জ্বালানির দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেঙে পড়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ব্যাপক হামলাগুলোও ইরানকে সামরিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে।
আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের খুব কম সদস্যই, যদি কেউ থেকেও থাকেন, সামরিক হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনাকে বিচক্ষণ পদক্ষেপ বলে মনে করতেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করলে ইরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, এসব হামলা প্রত্যাশিত ফলের উল্টো প্রভাব ফেলছে। এতে ইরান আরও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং দেশটির নেতারা জনগণের মনোযোগ বাইরের শত্রুর দিকে কেন্দ্রীভূত করতে পারছেন।
টানা দুই সপ্তাহ সংঘর্ষ চলার পর শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লড়াই কিছুটা কমেছে বলে মনে হয়। তবে একই সময়ে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় উত্তেজনা উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে। ইরানে টানা ১৩ রাত হামলার পর শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি।
শুক্রবারের বৈঠকের আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, নির্দেশ দিলে সামরিক বাহিনী আরও ভারী হামলা চালাতে প্রস্তুত, যদিও তিনি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছিলেন। শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরা হামলার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি। তাই হয়তো একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত আসবে, হয়তো আসবে না।’
এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন ইরান নিয়ে ট্রাম্পের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ, একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে করা সমঝোতা স্মারক ভেঙে পড়েছে।
পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও মার্কিন সামরিক কমান্ডার চলতি সপ্তাহের শুরুতে বলেন, ট্রাম্প ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি বহুপার্যায়ের বোমা হামলা অভিযানের প্রথম ধাপে অনুমোদন দেওয়ার দিকে ঝুঁকছিলেন। ওই অভিযানে উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ইরানের ছোট আক্রমণাত্মক নৌযানের বহর এবং পেন্টাগনের মতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত অন্যান্য স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা ছিল।
সম্ভাব্য উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রস্তুতি হিসেবে পেন্টাগন সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। সামরিক বাহিনী এমন বহু রেলসেতুও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেছে, যেগুলো সাধারণ মানুষ ব্যবহার করলেও একই সঙ্গে ইরানি সামরিক কমান্ডারদের হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে রসদ সরবরাহে সহায়তা করত। এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আরও হামলা, পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনা ও ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো—যার মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন অন্তর্ভুক্ত—আক্রমণের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল।
বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর আলোচনার আভাস দিয়ে বলেন, ‘আমি ভয়াবহ একটি হামলার কথা বিবেচনা করছি। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়। আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার খুব কাছাকাছি। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’
কিন্তু শুক্রবার গভীর রাতে ট্রাম্প সাময়িকভাবে সেই বড় বোমা হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেন। এর পেছনে অন্তত আংশিকভাবে তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের সেই মূল্যায়ন কাজ করেছে যে, জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। গত দুই সপ্তাহে এসব ঘাঁটি ইরানের ভারী হামলার মুখে পড়েছে। বড় ধরনের মার্কিন হামলা হলে ইরানের আরও শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল, যা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করত।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ২০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। প্রতিটির মূল্য ৪০ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি। প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের মতে, এতে মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। সামরিক কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহে বলেন, এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
এর পরিবর্তে ট্রাম্পের অনেক উপদেষ্টা, যার মধ্যে তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারও রয়েছেন, মনে করেন তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিকল্প পথ রয়েছে। সেটি হলো, দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং আলোচনা অব্যাহত রাখা। বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে কি না, কিংবা আলোচনা শুরু হলেও ইরানের সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কাটিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি পুনর্বহাল করা মার্কিন নৌ অবরোধ, যার লক্ষ্য ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজ, মিশ্র ফলাফল দিয়েছে। জুনের মাঝামাঝি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান আবার কিছু তেল, মূলত চীনে, রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান। সেই তেলের বড় অংশ এখন গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ পুরোপুরি কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মঙ্গলবার বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে ইরানের তেল আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত অর্থায়নকারী বাবাক জানজানির ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়টি প্রতিষ্ঠান এবং চারজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।