ইরানে হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত থামাতে কূটনীতির ওপরই এখন বেশি জোর দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য ইরানের বৈদ্যুতিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে সমঝোতার জন্য আর ১০ দিন সময় দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ইরান ইস্যুতে ধনী দেশগুলোর জোট জি৭-এর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মধ্যস্থতার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানও।
তবে আলোচনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চালিয়েই যাচ্ছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী। এ নিয়ে গতকাল শুক্রবার আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর মধ্য দিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। এরপর প্রথম এক সপ্তাহ কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। এই আলোচনার জন্য এগিয়ে আসে চীন। দেশটি তার প্রতিনিধিকে মধ্যপ্রাচ্যেও পাঠায়। যুদ্ধ থামাতে আলোচনাও হয়। এরপর তুরস্ককে দেখা যায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কূটনীতির মাঠে হাজির হয় পাকিস্তান। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানে যুদ্ধবিরতির শর্তসহ প্রস্তাব পৌঁছে দেয়। তেহরান এই প্রস্তাব খারিজ করে পাল্টা প্রস্তাব দিলেও ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই আলোচনা চলছে। আলোচনায় সমর্থন দিচ্ছে চীনও।
এ নিয়ে গতকাল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে কথা বলেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় সমর্থন জানিয়ে পাকিস্তানের প্রশংসা করেছে চীন।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর ইসহাক দার সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম এক্সে বলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিস্তৃত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করছি। আমরা অবিলম্বে উত্তেজনা কমানো, শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা এবং জাতিসংঘ সনদের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাগুলোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছি।’
ইরানে হামলার জেরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এরপরই মূলত নড়েচড়ে বসেন ট্রাম্প এবং আলোচনার উদ্যোগ নেন। গতকাল এ প্রসঙ্গে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসানো সহজ কাজ নয়। তবে এই আলোচনা এগিয়ে নিতে পারলে হরমুজ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা সহজ হবে।
দৌড়ঝাঁপ ট্রাম্পেরই
ইরানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে বলে একাধিকার দাবি করেছেন ট্রাম্প। এরপর তিনি ইরানের বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা চালানোর অবস্থান থেকে সরে এসে প্রথমে ৫ দিন সময় দেন তিনি।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনার সাড়া না পেয়ে এই সময়সীমা আরও বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। গতকাল সিএনএনের খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা আরও ১০ দিন স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ইরান সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির জ্বালানি স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় আগামী ৬ এপ্রিল রাত ৮টা পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ভুয়া সংবাদমাধ্যমের ভুল খবর প্রকাশের পরও আলোচনা ভালোভাবে চলছে।
যদিও ইরান বরাবর এই আলোচনার দাবি অস্বীকার করে আসছে।
জি৭-এর উদ্যোগ
আলোচনার দেনদরবারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র জি৭-এর শরণাপন্ন হয়েছে। ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে দুই দিন ধরে এই ধনী দেশগুলোর জোটের নেতারা ফ্রান্সে বৈঠক করছেন। এই বৈঠকে যাওয়ার আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার জন্য জি৭-এর দেশগুলোর উচিত তাঁদের পাশে থাকা।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর গতকাল মার্কো রুবিওর কাছ থেকে ইরানবিষয়ক মার্কিন পরিকল্পনা জানতে চাপ দিয়েছেন নেতারা। এই বৈঠকের পর গতকাল একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন নেতারা। তাঁরা বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা
আলোচনার কথা বললেও ইরানে হামলা বন্ধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার রাত ও গতকাল ব্যাপক হামলা হয়েছে দেশটিতে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং তাসনিম জানিয়েছে, দেশটির কোম শহরে বৃহস্পতিবার রাতের হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১০ জন। আবাসিক এলাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের আরাক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
আল জাজিরা বলছে, এই পরিস্থিতিতে ইরানে হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘তাদের (ইরান) চড়া মূল্য দিতে হবে... এবং যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা ইরানে পূর্ণ শক্তি দিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখব।’
পাল্টা হুমকিতে আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিসংলগ্ন এলাকাগুলো দ্রুত খালি করার আহ্বান জানিয়েছে। আইআরজিসি বলেছে, মার্কিন সেনাদের ‘যেখানেই পাওয়া যাবে’, সেখানেই তাদের ওপর হামলা চালানো আইআরজিসির ‘পবিত্র দায়িত্ব’।
এদিকে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা জোরদার করেছে ইরানও। গত বৃহস্পতিবার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে জাহাজ এবং ইসরায়েলের হাইফা বন্দরে তেলের ট্যাংকে হামলা চালিয়েছে ইরানের সেনা সদর দপ্তর। এ ছাড়া তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সৌদি আরবে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এ ছাড়া কুয়েতসহ অন্য মার্কিন মিত্রদেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এরই মধ্যে গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক শুরু হয়েছে। রাশিয়ার ডাকে শুরু হওয়া এই বৈঠকে ইরানে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।