ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ২০০ বছরের পুরোনো এক আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি—‘মনরো ডকট্রিন’। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার বর্তমান কার্যক্রম মূলত আমেরিকার এই ঐতিহাসিক এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বলয় রক্ষার নীতির প্রতিফলন।
মনরো ডকট্রিনের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৮২৩ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ইউরোপীয় শক্তির উদ্দেশে এক কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছিলেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল:
১. উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কোনো স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপের কোনো দেশ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
২. এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো উপনিবেশ স্থাপন করা যাবে না।
৩. কোনো ইউরোপীয় হস্তক্ষেপকে আমেরিকার নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখা হবে।
এর বিনিময়ে আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা ইউরোপের নিজস্ব বিবাদ বা তাদের বিদ্যমান উপনিবেশগুলোর বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
থিওডোর রুজভেল্ট ও আধিপত্যের বিস্তার
১৯০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই ডকট্রিনে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি ঘোষণা দেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা কোনো বড় সংকটে পড়ে, তবে আমেরিকা সেখানে ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ’ হিসেবে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ও দায়িত্ব রাখে।
পরবর্তী ২০ বছরে এই নীতির দোহাই দিয়ে আমেরিকা ডমিনিকান রিপাবলিক, হাইতি এবং নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলোতে সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চালায়, যা আজও অনেক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সমালোচনার বিষয়।
বর্তমান সংকট ও ভেনেজুয়েলা
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এবং সেখানে আমেরিকার আক্রমণাত্মক ভঙ্গি আবারও প্রমাণ করছে, ওয়াশিংটন লাতিন আমেরিকাকে তাদের ‘নিজস্ব আঙিনা’ হিসেবেই দেখে। ট্রাম্পের বক্তব্যে এটি পরিষ্কার, তিনি মনরো ডকট্রিনের সেই পুরোনো ছক ব্যবহার করেই এই অঞ্চলে বাইরের কোনো শক্তির (যেমন রাশিয়া বা চীন) প্রভাব রুখে দিতে চাচ্ছেন। গতকাল আকস্মিক সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক ধরে আনার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি সেটি পরিষ্কার করেই বলেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কূটনীতিবিদেরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কি কোনো একটি দেশ এভাবে পুরো একটি মহাদেশের ওপর তাদের একক আধিপত্য দাবি করতে পারে? মনরো ডকট্রিনের এই পুনর্জাগরণ লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি নাকি নিরাপত্তার ঢাল, তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।