যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত ফের চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ইরানে টানা সপ্তম রাতের মতো বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে গত মাসে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) কার্যত বাতিল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে, জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা নিহত ও একজন নিখোঁজের ঘটনায় ইরানের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সমানভাবে দায়ী করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ—এমনটাই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিটিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। মাত্র ১০ দিন আগে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিটি এখন ‘কার্যত শেষ’। এরপর তিনি ইরানি বন্দরে নতুন করে নৌ-অবরোধ আরোপ করেন এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি দেশটির আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস-কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের সমস্ত প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন ও স্থগিত করেছে। ফলে তেহরানও নিজের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে দেশকে রক্ষায় ব্যস্ত রয়েছে।’
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ মার্কিন প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, ‘চুক্তির কালির দাগ শুকানোর আগেই ওয়াশিংটন হামলা শুরু করেছে।’ অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরান যুদ্ধ চায়নি, তারা কেবল নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ থেকে আত্মরক্ষা করছে।
এদিকে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল।
দক্ষিণ ইরানের জাস্ক এলাকায় বুঞ্জি লবণাক্ততা দূরীকরণ (ডিস্যালাইনেশন) প্ল্যান্টে মার্কিন বিমান হামলায় একটি পানির পাম্প স্টেশন ও বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের ২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
এর পাল্টা জবাবে মার্কিন মিত্র কুয়েতের ওপর হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত সরকার তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে এবং দুটি বিদ্যুৎ ও পানি শোধন প্ল্যান্টে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। বাহরাইনেও হামলার আশঙ্কায় সাইরেন বাজানো হয়েছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের ভূখণ্ডে ধেয়ে আসা ১০টি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা কুয়েতের আল-আহমাদি বন্দরে মার্কিন সামরিক জ্বালানি জেটি, বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান সংযোজন কেন্দ্র এবং জর্ডানের আজরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে সফল হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহতের ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘থায়ার মার্শাল ইনস্টিটিউট’-এর অধ্যাপক এবং পেন্টাগনের সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস আল জাজিরাকে বলেন, ‘যেহেতু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে দেশের অভ্যন্তরে কোনো শক্তিশালী প্রেক্ষাপট তৈরি করেননি বা যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেননি, তাই মার্কিন জনগণ এই সেনা মৃত্যুর জন্য ইরানের সমপরিমাণে ট্রাম্পকেও দায়ী করবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের সমর্থকেরা ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা দেখতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে এমন হামলার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার আগে ট্রাম্প তেলের বাজার স্বাভাবিক রাখতে মরিয়া হলেও এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তাঁর রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই ক্রমাগত হামলার জন্য ওয়াশিংটনকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের এই বিরোধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা হামলার ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি যে কোনো সময় একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।