যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফায় হামলার ফলে যুদ্ধবিরতির সময় তৈরি হওয়া সাময়িক স্বস্তি ভেঙে আবারও গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে পড়েছেন সাধারণ ইরানিরা। যুদ্ধের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
রয়টার্সের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলা কয়েকজন ইরানি জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় সংকট এখন অর্থনীতি। রাজধানী তেহরানের ৪০ বছর বয়সী আলোকচিত্রী সোমাইয়েহ জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন সাপ্তাহিক বাজারের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—এক দিন যুদ্ধ, পরদিন শান্তি। আসলে কী ঘটবে, তা কেউ জানে না। দুই দিনের পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না।
পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দিস্তান প্রদেশের সানানদাজের ৩০ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী আমির জানান, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জানুয়ারিতে বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কাজ হারানোর পর নতুন করে কাজ শুরু করলেও যুদ্ধের কারণে আবারও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়। ফলে দূরবর্তীভাবে কাজ করার সুযোগ নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি ঋণের বোঝায় পড়ে যান। কয়েক দিন আগে নতুন চাকরি পেলেও আবার হামলা বাড়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ফিরে এসেছে।
একই শহরের ৩৪ বছর বয়সী মনোচিকিৎসক নাজানিন বলেন, একসময় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রিয়ালের ব্যাপক দরপতনের কারণে এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তা ছাড়া পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তাঁকে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রেখেছে। তিনি বলেন, ‘পরিবারের বাইরে থাকলে সব সময় আশঙ্কা হতো—বিমান হামলায় যদি তাঁদের বা আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’
সোমাইয়েহ জানান, আগে দেশ ছাড়ার ইচ্ছা থাকলেও এখন আর তা নেই। তিনি বলেন, ‘আমার জীবন, পরিবার ও বাড়ি এখানেই। কয়েক মাসের জন্য গেলেও শেষ পর্যন্ত তো ফিরতেই হবে।’
মাহাবাদ শহরের বাসিন্দা হিওয়া মনে করেন, যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক সংকট ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাস্তায় বিক্ষোভ ছাড়া মানুষের সামনে অন্য কোনো পথ না-ও থাকতে পারে।
এদিকে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে হাজারো মানুষের প্রাণহানির পর থেকে ইরান সরকার গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারির মাধ্যমে নতুন করে অস্থিরতা ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
তবু যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মাঝেও অনেক ইরানি দেশ ছাড়তে চান না। আমির বলেন, ‘আমরা আমাদের নিজেদের ঘর ছেড়ে যেতে চাই না। অন্য দেশে শরণার্থী হয়ে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তার চেয়ে নিজের দেশেই থাকতে চাই।’