লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা ধরে উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন ছুড়েছে। এর ফলে বারবার সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে এবং কয়েক লাখ ইসরায়েলি বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়। এই সময়ে ইরানও ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, এই মাসের শুরুতে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর এটি সবচেয়ে বড় হামলা। গোষ্ঠীটি ইরানের সমর্থনে হামলা শুরু করে। ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানের মুখে রয়েছে। এই বিমান হামলা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি।
গতকাল স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৮টার দিকে প্রথম ধাপে প্রায় ১০০টি রকেট ছোড়া হয়। একই সময়ে ইরান থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের দিকে ছোড়া হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এটিকে সমন্বিত হামলা বলে দাবি করেছে। পরে ইরান থেকে আরও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় ইসরায়েলের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে লক্ষ্য করে।
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর হামলাও প্রতিহত করার চেষ্টা চলে। তবু কয়েকটি আঘাতের ঘটনা ঘটে। যার ফলে আগুন লাগে এবং দুজন সামান্য আহত হন।
ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স সেবা সংস্থা মাজেন ডেভিড আদম জানায়, আহত দুজনের একজন ৩৫ বছর বয়সী নারী এবং অন্যজন পঞ্চাশের কোঠার একজন পুরুষ। বিস্ফোরণের পর উড়ে আসা বস্তুতে তাঁরা আহত হন। পরে তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। উদ্ধারকর্মীরা জানান, উত্তরাঞ্চলীয় শহর বিয়িনার একটি বাড়িতে রকেট আঘাত হানলে একজন সেখানে আহত হন। ঘটনাস্থলে আরও চারজনকে তীব্র আতঙ্কজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রের কাছে থাকার নির্দেশ দেয়। এই সময় হিজবুল্লাহ ড্রোন ও রকেট হামলা চালাতে থাকে। গ্যালিলি অঞ্চল, হাইফা শহর এবং লেবানন সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন এলাকায়ও সাইরেন বাজতে থাকে। আইডিএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের দিকে অন্তত ১৫০টি রকেট ছোড়ে।
হিজবুল্লাহর ছোড়া কয়েকটি দূরপাল্লার রকেট খোলা জায়গায় আঘাত হানে। এগুলো খোলা এলাকায় পড়বে বলে ধারণা থাকায় সামরিক বাহিনী সাইরেন বাজায়নি। হামলার সময় ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বাসিন্দারাও বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত হামলা অব্যাহত থাকে। নাহারিয়া, পশ্চিম গ্যালিলির কয়েকটি এলাকা, আক্রে শহর এবং হাইফার উত্তর উপশহরগুলোতে সন্দেহজনক ড্রোন অনুপ্রবেশ ও রকেট সতর্কতা জারি করা হয়।
হিজবুল্লাহ কয়েকটি দূরপাল্লার রকেটও ছোড়ে। এর ফলে তেল আবিব এবং আশপাশের শহরগুলোতে সাইরেন বেজে ওঠে। একই সময় আইডিএফ জানায়, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ইসরায়েল, জেরুজালেম এলাকা এবং দক্ষিণের কিছু অংশে সতর্কতা জারি করা হয়।
সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, কয়েকটি প্রজেক্টাইল প্রতিহত করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, কেন্দ্রীয় ইসরায়েলের একটি স্থানে আঘাতের কারণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বাধা দেওয়ার পর ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষও বিভিন্ন এলাকায় পড়ে।
হিজবুল্লাহর হামলার মধ্যে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, লেবাননের সরকার ব্যবস্থা না নিলে সংগঠনটির শক্ত ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘লেবাননের সরকারকে তাদের দেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। না হলে বৈরুতের যেসব এলাকা হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলো শিগগিরই গাজার মতো দেখাবে।’
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হিজবুল্লাহ মনে করছে, আমাদের মনোযোগ ইরান থেকে সরিয়ে নিতে পারবে। তারা ভাবছে, যদি আমাদের লেবাননের যুদ্ধে টেনে আনা যায়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে আমরা গতি কমিয়ে দেব।’ তাঁর ভাষায়, ‘হিজবুল্লাহ এমন একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে চায়, যাতে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক নীতি শেষ হয়ে যায় এবং আমরা আর কোনো হামলা না করি। সেটা ঘটবে না। তাই পরিস্থিতি গুরুতর সংঘাতের দিকে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে আরও সক্ষমতা ও বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে। আমরা একসঙ্গে ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারি।’