২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার সময় এবং পরবর্তী জিম্মি দশায় ব্যাপক যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে বলে একটি স্বতন্ত্র ইসরায়েলি তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ৩০০ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে—জিম্মিদের ব্যথা ও কষ্টকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং লাঞ্ছনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
বিবিসির তথ্যমতে, এই প্রতিবেদনটি ৪৩০ টিরও বেশি সাক্ষাৎকার (বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাবেক জিম্মি), ১০ হাজারের বেশি ছবি এবং ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আক্রমণকারীরা শুধু ব্যক্তিদেরই নয়, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
তদন্তকারীরা এই অপরাধগুলোকে ‘কাইনোসাইডাল সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি এমন এক ধরনের যৌন সহিংসতা যা পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বিপর্যয় ঘটাতে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নারী ও শিশুদের ওপর জীবিত এবং মৃত—উভয় অবস্থায় যৌন নিগ্রহ চালানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের পর ভুক্তভোগীদের হত্যা করা হয়েছে এবং মৃতদেহগুলোকে ‘ট্রফি’ হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি হলো—এক সঙ্গে জিম্মি থাকা আত্মীয়দের একে অপরের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়েছে।
নোভা মিউজিক ফেস্টিভ্যাল থেকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর বেঁচে ফেরা রাজ কোহেন জানান, তিনি এক নারীকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে পোশাক খুলে ধর্ষণ করতে দেখেছেন। আক্রমণকারীরা তাঁকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করার পরও মৃতদেহের ওপর পাশবিকতা চালিয়েছে। দারিন কোমারভ নামে আরেকজন জানান, তিনি পাশের কক্ষগুলো থেকে মানুষের চিৎকার শুনতেন এবং তারপর হঠাৎ সব স্তব্ধ হয়ে যেত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সহিংসতা কেবল হামলার দিনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গাজার সুড়ঙ্গ এবং বিভিন্ন গোপন আস্তানায় জিম্মিদের ওপর মাসের পর মাস নির্যাতন চালানো হয়েছে। ১৭ বছর বয়সী সাবেক জিম্মি আগাম গোল্ডস্টেইন জানান, নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা এবং প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি মানসিকভাবে মানুষকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। নারী ছাড়াও পুরুষ, শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও এই চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিষ্ঠাতা ড. কোচভ এলকায়াম-লেভি বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যৌন সহিংসতা ছিল একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যা অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’ তদন্তকারীরা এই কর্মকাণ্ডগুলোকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার শামিল বলে অভিহিত করেছেন। গভীর মানবিক বন্ধনগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ট্রমা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই ভয়াবহ অপরাধের মূল উদ্দেশ্য।