কাতারের আকাশসীমা থেকে হঠাৎ একটি মার্কিন তেলের ট্যাংকার নিখোঁজ হয়ে গেছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিমানটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটরাডার-২৪ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার আগে ইরানি উপকূলঘেঁষা পারস্য সাগর এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের উপকূলঘেঁষা পারস্য উপসাগরের আকাশে উড়তে থাকা বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার হঠাৎ ‘৭৭০০’ ডিস্ট্রেস সিগন্যাল পাঠায়। মূলত উড্ডয়নকালীন জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার সংকেত হিসেবে এই সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আকাশযানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছিল। পরে কাতারের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এর সিগন্যাল হারিয়ে যায়। বিমানটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তার অংশ হিসেবে কাজ করছিল।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা থেকে দেখা যায়, বিমানটি কিছু সময় আকাশে বৃত্তাকারে উড়তে থাকে, এরপর অবতরণের জন্য ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করে। জরুরি পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয় এবং এই ঘটনার সঙ্গে কোনো হামলার যোগসূত্র রয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এই নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানের এই জরুরি পরিস্থিতিতে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীও এখন পর্যন্ত বিমানটির অবস্থা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
এর আগে মার্চ মাসে, পশ্চিম ইরাকে হামলায় একটি কেসি=১৩৫ ধ্বংস হয়। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক ওই হামলার দায় স্বীকার করে। গোষ্ঠীটি দাবি করে, ‘আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা রক্ষার জন্য’ তারা বিমানটি ভূপাতিত করেছে।
কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার বিমান মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রধান এরিয়াল রিফুয়েলিং বিমান। এটি ১৯৫০-এর দশকে প্রথমবার তৈরি করে বোয়িং। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। চারটি টার্বোফ্যান সিএফএম ৫৬ সিরিজের ইঞ্জিন এই বিমানটিকে পরিচালনা করছে। বিমানটি সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ পাউন্ড বা প্রায় দেড় শ টন ওজন নিয়ে টেকঅফ করতে সক্ষম।
এই স্ট্র্যাটোট্যাংকারের দৈর্ঘ্য ১৩৬ ফুট ৩ ইঞ্চি, উইংস্প্যান বা দুই পাশের ডানার দৈর্ঘ্য ১৩০ ফুট ১০ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৪১ ফুট ৮ ইঞ্চি। ফ্লাইং বুমের মাধ্যমে বিমান থেকে বিমানে জ্বালানি স্থানান্তর করে, যা ফাইটার, বোমার এবং অন্যান্য বিমানের রেঞ্জ বাড়ায়।
বিমানটি সর্বোচ্চ গতি ৫০৪ নট (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৯৩৩ কিলোমিটার) এবং রেঞ্জ ১ হাজার ৩০৩ নটিক্যাল মাইল বা ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি (দেড় লাখ পাউন্ড জ্বালানি নিয়ে)। এটি ২ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত জ্বালানি বহন করতে পারে এবং সার্ভিস সিলিং ৫০ হাজার ফুট অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠতে পারে। জ্বালানির বাইরেও এই বিমাটির কার্গো ক্ষমতা ৮৩ হাজার পাউন্ড বা ৩৭ যাত্রী মালামালসহ বহন করা যায়।
এ ধরনের ট্যাংকার বিমান যুদ্ধের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে যখন যুদ্ধবিমান বা বোমারু বিমানকে দীর্ঘ পথ উড়তে হয়, তখন তাদের আকাশেই জ্বালানি সরবরাহ করে এগুলো, যাতে তারা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রস্তুত থাকে।
এটি এক বিশাল লজিস্টিক কার্যক্রম। একই সময়ে আকাশে অনেকগুলো জেট থাকে এবং প্রত্যেকটিরই জ্বালানি প্রয়োজন হয়। জ্বালানি ভরার প্রক্রিয়ায় গ্রহণকারী বিমানকে ট্যাংকারের খুব কাছাকাছি উড়তে হয়। এরপর ট্যাংকার থেকে একটি প্রোব (জ্বালানি সরবরাহের বাহু) বাড়িয়ে নিচের দিকে নামানো হয়।
যে বিমানটি জ্বালানি নেবে, তার পাইলট সেই প্রোবের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। ট্যাংকারের নিচে থাকা আলোর সংকেত ব্যবস্থার সাহায্যে তিনি নিজের অবস্থান ঠিক করেন, যাতে প্রোবটি সরাসরি জেটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
সংযোগ স্থাপনের পর জ্বালানি স্থানান্তর শুরু হয়, যা সম্পন্ন হতে কয়েক মিনিট সময় লাগতে পারে। এই পুরো সময় জ্বালানি নেওয়া বিমানটি বিশাল ট্যাংকারের একেবারে কয়েক ফুট দূরত্বে থাকে। এমনকি অনেক সময় এসব অভিযান রাতের অন্ধকারেও পরিচালিত হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে পাইলটের প্রচুর দক্ষতা প্রয়োজন হয়, যাতে তিনি প্রোবের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে পারেন। কখনো কখনো শাটলককের মতো আকৃতির ‘ড্রোগ’ বা একধরনের নোঙর ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে আশপাশে আরও অনেক বিমান থাকতে পারে। শত্রুর নজর এড়াতে জ্বালানি ভরার মিশনের সময় অনেক ক্ষেত্রে বিমানের সব আলো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়।